
চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস
আমাদের সমাজে কিছু মানুষের জীবন যেন গল্পের মতো। অভাব-অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা হাল ছাড়েন না; বরং নিজেদের শ্রম ও মেধাকে পুঁজি করে এগিয়ে চলেন। তেমনই একজন জীবনসংগ্রামী নারী সুরাইয়া সুলতানা সীমা। তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্প যেমন কষ্টের, তেমনি আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণারও।
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. দেলোয়ার হোসেন দুলুর ছোট মেয়ে সীমা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। সীমার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ছোট থাকতেই তাঁর বাবা তাঁদের মা ও চার সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হন। এরপর ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাবার সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই।
সীমা জানান, তাঁদের মা ও সন্তানদের রেখে বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় তাঁর দাদা ক্ষুব্ধ হয়ে বাবার অংশের সম্পত্তি তাঁর মায়ের নামে লিখে দেন। সেই সম্পত্তিটুকুই তাঁদের জীবনযাপনের শেষ সম্বল। এ কারণে বংশের অনেকের কাছ থেকে নানা চাপ ও বিরূপ আচরণও সহ্য করতে হয়েছে তাঁদের।
সময়ের সঙ্গে বড় দুই বোন ও ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়। তবে ছোট ভাই শুভর সংসারও বেশিদিন টেকেনি। সীমার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্ট এক ডিলারের খপ্পরে পড়ে তাঁর ভাই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। দেনার দায়ে একসময় তাঁর স্ত্রীও তাঁকে ছেড়ে চলে যান। একসময় শুভ পাঁচবিবি স্টেশন এলাকায় পুরোনো কাপড় বিক্রি করতেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় থাকেন।
সীমার নিজের জীবনেও সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ভালোবেসে বিয়ে করলেও বৃদ্ধা মাকে একা রেখে শ্বশুরবাড়িতে যেতে না পারায় তাঁর স্বামী একসময় অন্যত্র বিয়ে করেন। ফলে মায়ের মতো সীমার সংসার জীবনেও নেমে আসে বিচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তা।
তবে দুঃখকে কখনো দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি সীমা। বরং কষ্টকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। সংসারের অভাব মেটাতে স্কুলজীবন থেকেই কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি এলাকার ছোট-বড় অনেককে বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দেন।
দর্জির কাজ শেখার পর বড় বোনের কাছ থেকে একটি সেলাই মেশিন নিয়ে বাড়িতেই এলাকার মানুষের কাপড় সেলাই শুরু করেন। এর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন এবং ছোট একটি পুকুরে মাছ চাষ করেন। এসব কাজ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই মা-মেয়ের সংসারে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করেন। পরিশ্রম করে কিছু টাকা সঞ্চয় করে একটি ছোট বাড়িও তৈরি করেছেন তিনি।
সীমার সোজা কথা, “শরীরে যতদিন শক্তি থাকবে, অন্যের কাছে হাত পাতব না। নিজে কাজ করে ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে চাই।”
তাঁর জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চাইলে সীমা বলেন, “অভাব আর কষ্টেই যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার কষ্ট কিসের?” তিনি আরও জানান, একটি সেলাই মেশিন সরকার বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে পেলে বড় বোনের কাছ থেকে নেওয়া মেশিনটি তাঁকে ফেরত দিতে পারতেন।
সীমার এই জীবনসংগ্রামের গল্প জানতে পেরে আলো মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আহমেদ হোসাইন ছানু তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন। আলো মিডিয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা-গাজীপুর থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সীমার জন্য একটি সেলাই মেশিন তাঁর ঠিকানায় পাঠানো হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মেশিনটি তাঁর হাতে পৌঁছে যায়। কুরিয়ার সার্ভিসের খরচ বাবদ ৭০০ টাকা পরিশোধ করে সীমা মেশিনটি গ্রহণ করেন।
মেশিনটি হাতে পেয়ে সীমা আনন্দিত হন এবং ফোনের মাধ্যমে আলো মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আহমেদ হোসাইন ছানুকে ধন্যবাদ জানান।
আহমেদ হোসাইন ছানু সীমাকে বলেন, “আপনি মেশিনটি পেয়ে যে খুশি হয়েছেন, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার বিষয়। আপনি গ্রামের অসহায় নারীদের বিনা অর্থে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এই খবরটি শুনেই আলো মিডিয়া গ্রুপ আপনার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনার হাতে মেশিনটি পৌঁছে দিতে পেরে আমরা সবাই আনন্দিত।”
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে সীমাকে থ্রি-পিস ও গজ কাপড় কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তিনি সেলাইয়ের পাশাপাশি ব্যবসা করেও আয় করতে পারেন।
সীমার এই সংগ্রামী পথচলা শুধু বেঁচে থাকার গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে বাঁচার গল্প। নিজের শ্রম ও দক্ষতাকে সম্বল করে এগিয়ে চলা এই নারীর মুখে নতুন সেলাই মেশিনের মাধ্যমে আরও স্বাবলম্বিতার হাসি ফুটবে এমন প্রত্যাশা আলো মিডিয়া গ্রুপের।
সীমার এই মানবিক ও ইতিবাচক মনোভাব যেন চিরদিন অটুট থাকে এবং অপ্রত্যাশিত কোনো কষ্ট যেন আর তাঁকে স্পর্শ না করে এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন আলো মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আহমেদ হোসাইন ছানু।
উপদেষ্টা: এম ফখরুল ইসলাম ফয়েজ। সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল হাই। বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: উপজেলা পরিষদ রোড, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। যোগাযোগ: মোবাইল: ০১৭১৫-১৭৩০০১ ই-মেইল: abdulhye.jp@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬