
আয়াত উল্ল্যাহ, ঢাকা:
মাননীয় সুপ্রিম কোর্টে দায়েরকৃত রিট পিটিশন নিষ্পত্তি না করে, মাঠ প্রশাসনের প্রতিবেদন এবং জনমতের সুস্পষ্ট মতামতকে উপেক্ষা করে সদ্য ঘোষিত 'ফটিকছড়ি উত্তর' (ভুজপুর) উপজেলার সাথে ১১ নং সুয়াবিল ইউনিয়নকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার চক্রান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। একই সাথে এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে 'নিকার' সভায় অনুমোদিত মূল প্রস্তাব অনুযায়ী সুয়াবিলকে অন্তর্ভুক্ত না রেখে পূর্বের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে।
গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) বিকেল ৪:০০ টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে 'বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম, সুয়াবিল, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম'-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি ও প্রতিবাদ জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের নেতৃবৃন্দ প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকদের সামনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
উন্নয়নমুখী উদ্যোগকে স্বাগত, তবে সুয়াবিলবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মানা হবে না
লিখিত বক্তব্যে ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ সরকার জনগণের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন উপজেলা গঠনের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, আমরা সেই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। উন্নয়ন, সুশাসন ও জনকল্যাণমুখী যেকোনো ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়নের ১ লক্ষ মানুষের নাগরিক অধিকার, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক সেবা প্রাপ্তির সুযোগের সাথে এই সিদ্ধান্ত গভীরভাবে জড়িত। ফলে জনমত উপেক্ষা করে কোনো একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া মেনে নেওয়া যায় না।
আন্দোলনের অরাজনৈতিক অবস্থান:
সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। এটি সম্পূর্ণ জনস্বার্থভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ এবং সুয়াবিলবাসীর ন্যায়সঙ্গত নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
যে কারণে সুয়াবিলবাসী এই অন্তর্ভুক্তির বিরোধী (প্রশাসনিক, ভৌগোলিক ও আইনি তথ্য):
সংবাদ সম্মেলনে সুয়াবিলকে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত করার পেছনের অসংগতি এবং মানচিত্র অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট দূরত্বের চিত্র তুলে ধরা হয়:
১. ভৌগোলিক বাস্তবতা ও চরম যাতায়াত কষ্ট (মানচিত্র অনুযায়ী দূরত্ব):
ফোরামের উপস্থাপিত মানচিত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত 'ফটিকছড়ি উত্তর' উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সাথে সুয়াবিলের দূরত্ব অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ও দীর্ঘ, যা সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে অচল করে দেবে। সুয়াবিল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রের দূরত্ব নিম্নরূপ:
বাগান বাজার: ৪৫ কিলোমিটার
দাঁতমারা: ৩২ কিলোমিটার
নারায়ণহাট: ২৫ কিলোমিটার
ভূজপুর (প্রস্তাবিত উপজেলা সদর এলাকা): ১৭ থেকে ২০ কিলোমিটার
বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা সদর: মাত্র ৪.৫ থেকে ৫ কিলোমিটার
নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন তোলেন, যেখানে মাত্র ৪.৫ কিলোমিটার দূরে বর্তমান উপজেলা সদরে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান, সেখানে ২৫ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরের একটি অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন উপজেলায় সুয়াবিলবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জরুরি জনসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
২.সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন:
সুয়াবিল ইউনিয়ন ও নাজিরহাট পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডগুলোর মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক বর্তমান ফটিকছড়ি উপজেলা কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
৩.পূর্বের মূল প্রস্তাবসমূহ:
গত ০১/০৩/২০২১ তারিখে (স্মারক নং-২৭৩) তৎকালীন ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সায়েদুল আরেফিন ভুজপুর উপজেলা গঠনের যে প্রথম প্রস্তাব প্রেরণ করেছিলেন, তাতে উত্তর ফটিকছড়ির পাঁচটি ইউনিয়নকে (বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর এবং হারুয়ালছড়ি) নিয়ে এই নতুন উপজেলা গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সেখানে সুয়াবিল অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
পরবর্তীতে ০৫/০৯/২০ ২০২৩ তারিখে (স্মারক নং ৯০/০১) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাব্বির রহমান সানি সুয়াবিল ইউনিয়নকে বাদ দিয়েই পূর্বের ৫টি ইউনিয়নের মতামতসহ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করেন।
এমনকি ২৪/০৯/২০২৩ তারিখে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মহোদয়ের প্রেরণকৃত সরজমিন প্রতিবেদনেও সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার অংশ বিশেষ (০১, ০২ ও ০৩ নং ওয়ার্ড) এর নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
৪.রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়মের লঙ্ঘন:
নেতৃবৃন্দ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত আগস্ট ২০২৪ দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কোনো ধরনের সরকারি নিয়মের তোয়াক্কা না করে, এক অদৃশ্য শক্তির প্ররোচনায় সুয়াবিল ইউনিয়নের নাম যুক্ত করে মতামত প্রেরণ করেন।
৫. চলমান আইনি জটিলতা ও আদালতের অবমাননা:
বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ (উপজেলা-১ শাখা) এর ০৭/০১/২০২৬ তারিখের স্মারক অনুযায়ী, সুয়াবিল ইউনিয়ন ও নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডকে বাদ দিয়ে নতুন প্রস্তাবনার জন্য ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যা বর্বতমানে বিচারাধীন। র্তমানে হাইকোর্টে এই বিষয়ে তিনটি সুনির্দিষ্ট মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে (মামলা নং: ১৪७৮/২০২৬, ২১৭৮/২০২৬ ও ৪৪৮৯/২০২৬)। বিচারাধীন বিষয় উপেক্ষা করে এবং জনমতের তোয়াক্কা না করে ১ জুলাই ২০২৩ তারিখের নিকার (NICAR) সভার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুনরায় অনুমোদন করা হয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়া ও সুশাসনের পরিপন্থী।
পূর্ববর্তী ধারাবাহিক আন্দোলন:
সুয়াবিল এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালনা করা হয়েছে। যার অংশ হিসেবে:
০৭/১০/২০২৫ তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর গণস্বাক্ষরযুক্ত স্মারকনামা প্রদান।
১৪/১০/২০২৫ তারিখে সংবাদ সম্মেলন ও জাতীয় প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রতিবাদ প্রকাশ।
১৮/১০/২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে বিশাল মানবমিছিল কর্মসূচি।
২৬/১০/২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মহোদয়ের মাধ্যমে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় বরাবর স্মারকনামা প্রদান ও দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা।
সরকারের প্রতি ৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি:
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে 'বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম'-এর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৪টি বিনীত কিন্তু দৃঢ় দাবি উত্থাপন করা হয়:
প্রথমত: ঘোষিত 'ফটিকছড়ি উত্তর' উপজেলা থেকে ১১ নং সুয়াবিল ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
secondly: এলাকাবাসীর মতামত, ভৌগোলিক বাস্তবতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে পূর্বের ন্যায় নিরপেক্ষভাবে পুরো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা ও পর্যালোচনা করতে হবে।
Thirdly: উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয়সমূহ নিষ্পত্তি হওয়ার পূর্বে কোনো রূপ চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
fourthly: স্থানীয় জনগণের অংশীজন নিশ্চিত করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় উপজেলা পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আহ্বান ও সমাপনী:
উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে নেতৃবৃন্দ বলেন, "আপনারা জাতির বিবেক। সত্য, ন্যায় এবং জনগণের কণ্ঠস্বর দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব আপনাদের ওপর ন্যস্ত। আমরা আশা করি, আপনারা আমাদের এই ন্যায়সঙ্গত, শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক দাবিকে নিরপেক্ষভাবে জাতির সামনে তুলে ধরবেন।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, "আমরা সরকারকে প্রতিপক্ষ মনে করি না, বরং জনগণের অভিভাবক হিসেবে দেখি। তাই আমাদের বিশ্বাস, সরকার জনগণের ন্যায্য অধিকার ও জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে আদালতের নির্দেশনা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন।" আমাদের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, আছে শান্তিপূর্ণ এবং ভবিষ্যতেও শান্তিপূর্ণ থাকবে। আমরা সুয়াবিলবাসী ঐক্যবদ্ধ এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আসুন, জনগণের মতামতের প্রতি সম্মান জানাই, আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখি এবং একটি নাগরিকবান্ধব, জনবান্ধব প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলি।
সংবাদ সম্মেলন শেষে ফোরামের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এবং সুয়াবিলবাসীর এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন সফল করতে গণমাধ্যমের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন।
উপদেষ্টা: এম ফখরুল ইসলাম ফয়েজ। সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুল হাই। বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়: উপজেলা পরিষদ রোড, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ। যোগাযোগ: মোবাইল: ০১৭১৫-১৭৩০০১ ই-মেইল: abdulhye.jp@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬