১২:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক বেঞ্চের ৩ বন্ধুর একসাথে চিরবিদায়, শোকে কাঁদছে গোয়াইনঘাটবাসি

  • Update Time : ০১:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
  • / 13

আবুল কাশেম রুমন, সিলেট থেকে:

সিলেটের গোয়াইনঘাটে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একসাথে প্রাণ হারালো এক বেঞ্চের তিন বন্ধু। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ছিল একই ক্লাসের সহপাঠী, একই স্বপ্নের পথযাত্রী। একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, গল্প-আড্ডায় মেতেছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই তিন বন্ধুকেই বিদায় নিতে হলো একসঙ্গে।

নিহতরা হলো জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ (১৬), রায়হান আহমেদ রাহুল (১৬) ও জয় আহমদ (১৬)। তাদের অকাল মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গোয়াইনঘাট।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
রোববার (৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চলমান পরীক্ষা শেষে বেড়াতে গিয়ে উপজেলার জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। গুরুতর আহত তিন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তারা মারা যায়।

নিহতরা হলো- উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব, ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান হবি মিয়ার ছেলে রায়হান এবং লাখেরপাড় গ্রামের আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয়।

একসাথে জানাজা, একসাথে দাফন
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) একসাথে তিন বন্ধুর জানাজা শেষে তাদের নিজ সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বাড়িতে বুকফাটা কান্না
সোমবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না, আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার ডেকে বলছেন, “একবার ফিরে আয় বাবা, আরেকবার মাকে ডেকে যা।”

এক মায়ের আর্তনাদ, “সকালে হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে গেল, সন্ধ্যায় আমার বুক খালি করে ফিরে এলো।” আরেক মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

বন্ধুত্ব ছিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে
পারিবারিক সূত্র জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তিন বন্ধুর মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল, খেলাধুলা কিংবা অবসরের প্রতিটি মুহূর্তে তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। এখন তারা পাশাপাশি কবরের নীরব বাসিন্দা।

সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, “আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, তা যার সন্তান হারিয়েছে সেই শুধু বুঝবে।”

রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, “সাকিবের মৃত্যুর খবরেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। তখনও আশা ছিল আমার ছেলেটা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই আশাটাও শেষ হয়ে গেল।”

জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া বলেন, “তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। কখনো ভাবিনি, আল্লাহ ওদেরও একসঙ্গে নিয়ে যাবেন। এখন তিনটি পরিবার একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।”

এ ঘটনায় জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা একে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠী নূর হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “এক বেঞ্চের তিন বন্ধু এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো ভাবিনি।”

Please Share This Post in Your Social Media

এক বেঞ্চের ৩ বন্ধুর একসাথে চিরবিদায়, শোকে কাঁদছে গোয়াইনঘাটবাসি

Update Time : ০১:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

আবুল কাশেম রুমন, সিলেট থেকে:

সিলেটের গোয়াইনঘাটে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একসাথে প্রাণ হারালো এক বেঞ্চের তিন বন্ধু। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ছিল একই ক্লাসের সহপাঠী, একই স্বপ্নের পথযাত্রী। একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, গল্প-আড্ডায় মেতেছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই তিন বন্ধুকেই বিদায় নিতে হলো একসঙ্গে।

নিহতরা হলো জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ (১৬), রায়হান আহমেদ রাহুল (১৬) ও জয় আহমদ (১৬)। তাদের অকাল মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গোয়াইনঘাট।

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
রোববার (৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চলমান পরীক্ষা শেষে বেড়াতে গিয়ে উপজেলার জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে তাদের বহনকারী মোটরসাইকেলটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। গুরুতর আহত তিন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তারা মারা যায়।

নিহতরা হলো- উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব, ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান হবি মিয়ার ছেলে রায়হান এবং লাখেরপাড় গ্রামের আব্দুল রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয়।

একসাথে জানাজা, একসাথে দাফন
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) একসাথে তিন বন্ধুর জানাজা শেষে তাদের নিজ সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বাড়িতে বুকফাটা কান্না
সোমবার নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না, আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন, কেউ বারবার ডেকে বলছেন, “একবার ফিরে আয় বাবা, আরেকবার মাকে ডেকে যা।”

এক মায়ের আর্তনাদ, “সকালে হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে গেল, সন্ধ্যায় আমার বুক খালি করে ফিরে এলো।” আরেক মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

বন্ধুত্ব ছিল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে
পারিবারিক সূত্র জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই তিন বন্ধুর মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। স্কুল, খেলাধুলা কিংবা অবসরের প্রতিটি মুহূর্তে তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। এখন তারা পাশাপাশি কবরের নীরব বাসিন্দা।

সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, “আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ যে কত ভারী, তা যার সন্তান হারিয়েছে সেই শুধু বুঝবে।”

রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, “সাকিবের মৃত্যুর খবরেই আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। তখনও আশা ছিল আমার ছেলেটা হয়তো ফিরে আসবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই আশাটাও শেষ হয়ে গেল।”

জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া বলেন, “তিন বন্ধু সব সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। কখনো ভাবিনি, আল্লাহ ওদেরও একসঙ্গে নিয়ে যাবেন। এখন তিনটি পরিবার একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।”

এ ঘটনায় জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা একে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠী নূর হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “এক বেঞ্চের তিন বন্ধু এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো ভাবিনি।”