মো: আব্দুল হাই::
স্বাধীন বাংলার প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য বরেন্য রাজনীতিবিদ মরহুম আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ আজাদের ৯৮ তম জন্ম বার্ষিকী পালন করা হয়েছে।
আজ বুধবার সকাল ১১টায় জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান নেতা সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সিদ্দিক আহমদ বলেন, সামাদ আজাদ ছিলেন আওয়ামী রাজনীতির কিংবদন্তী আপাদমস্তক একজন মহান নেতা। সামাদ আজাদ এই অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করে স্বীয় কর্মের মাধ্যমে আমাদেরকে দেশ-বিদেশে পরিচিতি করে তুলেছেন।
তিনি বলেন, সামাদ আজাদের নেতৃত্বে জগন্নাথপুর তথা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল আওয়ামী লীগের দূর্গ হিসেবে গড়ে উঠে। তিনি সামাদ আজাদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস তুলে ধরে মহান এ নেতার আদর্শকে লালন করে দলীয় নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাওয়ার আহবান জানান।
জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আকমল হোসেনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজুর পরিচালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ, সহ সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম মশাহিদ, যুগ্ম সম্পাদক মো: লুৎফুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দ্বীপ সূত্রধর বীরেন্দ্র, প্রচার সম্পাদক আব্দুল জব্বার, তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কুমার দেব, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুজিবুর রহমান মুজিব, সদস্য মো: নুরুল হক, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ডাঃ আব্দুল আহাদ, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো: আব্দুল গফুর, হাজী জমশেদ মিয়া তালুকদার, সৈয়দ লাল মিয়া, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনোয়ার আলী, মনু মো: মতচ্ছির আলী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বশির আহমদ, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মো: কদরিছ মিয়া, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মো: কামাল উদ্দিন, সহ সভাপতি ফজরুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ রুহেল, কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাহা আহমদ প্রমুখ।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সুজিত কুমার রায়, সদস্য সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো: আইয়ুব খান, বন ও পরিবেশ সম্পাদক জালাল হোসেন(কদ্দুছ কামালী), মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক কুতুব উদ্দিন, জগন্নাথপুর পৌরসভার কাউন্সিলর মো: আবাব মিয়া, কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ সোহেল আহমদ, গিয়াস উদ্দিন মুন্না, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ দপ্তর সম্পাদক মাসুম আহমদ, কলকলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফখরুল ইসলাম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলা উদ্দিন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ সালেহ আহমদ ছোট মিয়া, শাহ্ জামাল, পৌর আওয়ামী লীগ নেতা মো: ইউনুছ মিয়া, যুবলীগ নেতা নজরুল ইসলাম, রমজান আলী ছানা, আকমল হোসেন ভূঁইয়া, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক এম মোতাহীর আলী, প্রচার সম্পাদক আক্তার হোসেন, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাফরোজ ইসলাম প্রমুখ। পরে দলীয় কার্র্যালয়ে আনন্দমূখর পরিবেশে কেক কেটে ৯৮তম জন্মদিন পালন করা হয়।
প্রসঙ্গত: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক পররাষ্ট্রামন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য, প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ দীর্ঘ দুর্ভোগ, জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতনের হুলিয়া মাথায় নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি করেছেন তিনি।
আব্দুস সামাদ আজাদ তৎকালীন সিলেট জেলার জগন্নাথপুর থানার ভূরাখালি গ্রামে ১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শরীয়ত উল্লার দ্বিতীয় পুত্র সামাদ আজাদ প্রথমে গ্রামের স্কুলে ও পরে দিরাই উপজেলার জগদল ভাটিরগাঁও স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষের পর ১৯৪৩ সনে তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক এবং ১৯৪৮ সনে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও ইতিহাস শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও ইতিহাস বিষয়ে তিনি এম এ পাশ করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে সরকার তার এম এ ডিগ্রি কেড়ে নেয়।
পুরো ভারতবর্ষ যখন এক দেশ তখনই রাজনীতিতে অভিষেক ঘটেছিলো আব্দুস সামাদ আজাদের। ১৯৪০ সালে সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হন তিনি। পরে অবিভক্ত আসামের সভাপতির দায়িত্ব পান। ১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করায় বিপাকে পড়েন ছাত্রনেতা সামাদ আজাদ। এমনকি এ ‘অপরাধে’ তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে কিছুদিন অন্য দুটো পরিচয় নিজের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন সামাদ আজাদ। তার ‘মাস্টার সাব’ পরিচয়টি অনেকেরই অজানা। অজানা রয়েছে তার বীমা নির্বাহী পরিচয়টিও। অজানা থাকারই কথা, রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে যে পরিচয় তিনি অর্জন করেছেন তার সামনে আর কোনো পরিচয় টিকে থাকতে পারেনি।
১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তখন চলছে ভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে সামাদ আজাদকে কারাবরণও করতে হয়। রাজনৈতিক দক্ষতার কারণে ১৯৫৩ সালে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান আব্দুস সামাদ আজাদ। পরের বছর যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগ-যুবলীগ অধ্যায়ের ইতি ঘটিয়ে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন আব্দুস সামাদ আজাদ। আদর্শগত কারণে ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরলে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আব্দুস সামাদ আজাদ কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক আইন জারি হলে আটক হন তিনি। চার বছর জেল খাটার পর তিনি মুক্তি পান। ১৯৬৪ সালে আবারো গ্রেপ্তার হন তিনি।
স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তুঙ্গ সময়ে ১৯৬৯ সালে সামাদ আজাদ ফিরে আসেন নিজের ঘর আওয়ামী লীগে। নির্বাচিত হন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে তিনি সিলেট থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন।
আন্দোলনের পথ বেয়ে আসে মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন আব্দুস সামাদ আজাদ। প্রথমে তিনি মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত। দেশে দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচনে আব্দুস সামাদ আজাদ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্ব পরিবারে হত্যার মাধ্যমে পটপরিবর্তন হলে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে গ্রেপ্তার হন সামাদ আজাদ। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কারাগারের অন্ধকারেই থাকতে হয় আব্দুস সামাদ আজাদকে। মুক্তির পর পঁচাত্তরের ধাক্কায় টালমাটাল আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আব্দুস সামাদ আজাদ।
নিপীড়ন-নির্যাতনেও রাজনীতির মাঠ কখনোই ছেড়ে যাননি সামাদ আজাদ। ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধের পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও মাঠে ছিলেন শুরু থেকেই। এরশাদ সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে গণতন্ত্রের মুক্তিতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এ সময় তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এই মেয়াদে পান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। ২০০১ সালের পরবর্তী নির্বাচনেও তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মহান নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ।