“পাষান মনরে বুঝাইয়ও চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লইও“ রাধারমন দত্তের ১০8তম প্রয়ান দিবস আজ

মো: আব্দুল হাই::

কারে দেখাবো মনের দু:খ গো বুক চিরিয়া

অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।।

শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে নিরলে তোমারে পাইলাম না।

ওরে আমার মনে যত দু:খ ছিল আমি কইতে পারলাম না।।

মরমী কবি বাউল সাধক রাধারমণ দত্তের ১০৪ তম প্রয়ান দিবস আজ রোববার (১০ নভেম্বর)। এ উপলক্ষে রাধারমণ সমাজ কল্যাণ সাংস্কৃতিক পরিষদের আয়োজনে ২দিন ব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আগামী কাল সোমবার ও মঙ্গলবার অনুষ্টিত হবে।

বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার একটি অন্যতম উপজেলা হচ্ছে জগন্নাথপুর। বাংলা মরমি সাহিত্যের অব্যাহত ধারায় এ উপজেলার  অবদান অপরিসীম। সারা দেশের ন্যায় জগন্নাথপুরের বুকেও বহু পীর, দরবেশ, সাধু সাধক, সন্যাসি জন্ম গ্রহন করেছেন এবং তাদের বাণীর মাধ্যমে এ দেশকে পূন্য ভুমিতে পরিণত করেছেন। সূফিসাধকরা তাদের স্ব স্ব ধারায় মরমি সাহিত্যের প্রচুর সম্পদ রেখে গেছেন। যা গবেষনার বিষয় হয়ে রয়েছে। তারা চিত্তবৃত্তের এই সূরময় ভুবনে পদচারনা করে নিজস্ব সৃষ্টি ধারায় মরমি সাহিত্যের যে অমিয় প্রবাহ বইয়ে দিয়েছিলেন  তা আজও দেশের মাটি ও বাতাসে অপূর্ব  ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে চলেছে। উপমহাদেশের আত্মাধিকতা বা মরমি সাধনার মূল কেন্দ্র বিন্দুর স্রোত ধারা যদিও বাংলা এবং ভারতের বাহিরেই জন্মলাভ করেছে, কিন্তু পরবর্তীকালে এ সূফি ধারা ও মরমি বাদ বাংলার উর্বর শ্যামল জমিতেই বিকাশ লাভ করেছে আশ্চর্যজনক ভাবে। সূফি সাধক সৈয়দ শাহ হোছন আলম, মরমি কবি সৈয়দ আসহর আলী চৌধুরী, সৈয়দ শাহনুর, রাধারমন, মুন্সি রহমতুল্লাহ, আছিম শাহ, কালু শাহ সহ  আউল বাউলের বিচরন ভুমি এই জগন্নাথপুর। এদের গান আজ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে মাটি ও মানুষের লোহিত কনায়।

                মরমী কবি রাধারমন দত্ত জন্মগ্রহন করেন ১২৪০বঙ্গাব্দে বা ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে জগন্নাথপুর উপজেলার পৌর শহরের কেশবপুরে। পিতার নাম রাধা মাধব দত্ত পুরকায়স্থ ও মাতার নাম সুবর্ণা দেবী।

কৃঞ্চ প্রেমতত্ত্ব বিষয়ক গান রচনা করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ভারতের কাচার জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে  এখনও অমর হয়ে রয়েছেন। প্রবাদ রয়েছে হাছন রাজা পত্র মারফত রাধারমনকে তার সুনামগঞ্জের তেঘরিয়াস্থ বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন, তিনি কবিতার ভাষায় আহবান করেছিলেন “রাধারমন আছো কেমন, হাছন রাজা জানতে চায়”। পত্র প্রাপ্তির পরে রাধারমন  তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুুতি হলেও  কি একটা অসুবিদা ঘটায় হাছন রাজার সাথে মিলিত হতে না পেরে লিখেছিলেন “ গানের সেরা রাজা হাছন, পেলাম না তার চরন দর্শন, বিফলে দিন গেল গইয়া”। অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের ভাষায় সিলেটের আকাশ বাতাস বাউল গানের সুরের দ্বারা যিনি আকুলিত ও ব্যকুলিত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন জগন্নাথপুরের রাধারমন।

                রাধারমন সঙ্গীতের কয়েকখানা বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। মুন্সী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন “রাধারমন সঙ্গীত” নামে ও সুনামগঞ্জের মরহুম আব্দুল হাই ভাইবে রাধারমন বলে  নামে বইটি প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত লোকতত্ত্ববিদ চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্য ভুষনের  প্রায় চল্লিশ বছরের সংগ্রহের গানগুলো নিয়ে সিলেট মদনমোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদ একটি বই প্রকাশ করেন। এতে ৩ শতাধিক গান স্থান পায়। এছাড়াও রাধারমন একাডেমি কর্তৃক জনপ্রিয় নাট্য অভিনেতা ক্রিড়া সংগঠক জুবায়ের আহমদ হামজা ও মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিনের সম্পাদনায় রাধারমন দত্ত স্মারক গ্রন্থ সহ সুনামগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসন মোহাম্মদ আলী খান কর্তৃক বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। রাধারমন সঙ্গীতের সংখ্যা ২/৩ সহস্রাধিক হবে। রাধারমন দত্ত শিল্পি, সুরকার ও একজন ভাল অভিনেতা ছিলেন। রাধারমন সম্পর্কে অনেক অলৌকিক কথাও লোক মূখে শোনা যায়।

                রাধারমন ভাবে বিভোর হয়ে গান রচনা করতেন। শিষ্যরা শুনে তা লিখে রাখতেন। তিনি তত্ত্বসংগীত, দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, বিরহ, আক্ষেপ, মান, ধামাইল ইত্যাদি বিভিন্ন শাখার গান রচনা করতেন। বাংলার বধূ ও যুবতিদের কণ্ঠে বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্টানে এখনও ভাইবে রাধারমন বলে, ভনিতাযুক্ত ধামাইল গান শুনা যায়। তাছাড়া গ্রাম বাংলার  হাটে-মাঠে মনের সূখে বা দু:খে অনেকেই উতলা মনে গান গেয়ে পথ চলতে দেখা যায়। মাঝিরা মহানন্দে প্রেম বিরহের গানের সূর টানতে টানতে নৌকা চালায়। তাছাড়া দেশের ভাটি অঞ্চলে চাষীদের যখনই অবকাশ মেলে তখনই জমিয়ে দেয় তারা বাউল গানের আসর। এসব গানের অধিকাংশই ‘ভাইবে রাধারমন বলে ভনিতাযুক্ত। বাংলাদেশ ও ভারতের বেতার ও টেলিভিশন রাধারমনের গান প্রায় সময় প্রচার করে আসছে। চলচিত্রেও রাধারমনের বেশ কিছু গান সংযোজিত হয়েছে।

রাধা রমনের কয়েকটি গানের ধূয়া নিন্মে প্রদত্ত হলো:-

দেহতত্ত্ব:-

(১) ভবনদীর ঢেউ দেখিয়া

দাড়াইয়া রইয়াছি কূলে

দয়াল গুরু পারকর

দীনহীন কাঙ্গালে।

(২) ওরে ও রসিক নাইয়া, ও সুজন নাইয়া

ভব সাগর পাড়ি দেওরে বেলা যায়রে গুইয়া।

ভক্তিমূলক:-

 তোমার পাদপন্থে মজিয়া থাক

হরি হে আমার এই বাসনা।

আমি বাঞ্চা করি তোমায় হেরি

বংশীধারী কাল সোনা।

ভজন:-

 দয়াল গুরু বিনে বন্ধু কেহ নাই এ সংসারে

দয়াল বন্ধু কৃপা সিন্ধু বিপদ অঞ্জন মূলাধার।

ভাই বন্ধু পরিবার কেবা সঙ্গে যায় কার

মরিতে মমতা নাই ত্বরায় করে ঘরের বার।

বিরহ:

(১) ও প্রান বৃন্দে আমার প্রান যায় প্রান বন্ধু বিহনে

(২) সখী রাত্র হইল ভোর আইল না মোর প্রান প্রিয়া নিদয়া নিষ্টুর।

(৩) কারে দেখাব মনের দু:খ গো বুক চিরিয়া, অন্তরে তুষের অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।

(৪)শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে নিরলে তোমারে পাইলাম না।

আক্ষেপ:-

(১) প্রান সখী ললীতে কি জন্য আসিলাম আমি কুঞ্জতে।

(২) বন্ধের বাশি মন উদাসী করিল আমারে. নাম ধরিয়া বাজে বাঁশি ঘরের দুয়ারে।

মান:

পাষান মনরে বুঝাইয়ও চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লইও

ধামাইল:

তোমরানি দেখিয়াছ শ্যামের মূখ ওগো সারি শুক। প্রেমানলে অঙ্গ জ্বলে ফাটিয়া যায় বুক।

রাধারমন দত্তের সাধনা ছিল সহজিয়া বৈঞ্চব পদ্ধতি। সংগীত ছিল তার সাধনার অন্তর্ভূক্ত। প্রায় ৩২বছর তিনি সাধনা করেছেন। রাধারমন দত্ত প্রায় ৮২বছর বয়সে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ ১৩২২বাংলার ২৬কার্তিক শুক্রবার শুক্লা ষষ্টিতে মরদেহ ত্যাগ করেন।

বৈঞ্চব পদাবলির মহা রাজা মরমি সাধক কবি রাধারমন দত্তের ১০৪তম প্রয়ান দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়েছে।

রাধারমন সমাজ কল্যান সাংস্কৃতিক পরিষদ কর্তৃক রাধারমন দত্তের জন্ম মাটি জগন্নাথপুর পৌর শহরের কেশবপুর বাজার এলাকায় আয়োজিত অনুষ্টানের প্রথম দিন(১১ নভেম্বর) প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ । বিশেষ অতিথি থাকবেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বি.পি.এম। প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল মনাফ। দ্বিতীয় পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে সভাপতিত্ব করবেন রাধারমন সমাজ কল্যান সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি মো: জিলু মিয়া।

দ্বিতীয় দিন(১২ নভেম্বর) প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুনামগঞ্জ জেলার সহ-সভাপতি বর্ষীয়ান নেতা সিদ্দিক আহমদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জগন্নাথপুর উপজেলা সভাপতি আকমল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজু। প্রথম পর্বের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন জগন্নাথপুর পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব আব্দুল মনাফ। দ্বিতীয় পর্বের সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে সভাপতিত্ব করবেন রাধারমন সমাজ কল্যান সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি মো: জিলু মিয়া।

২দিন ব্যাপি মনোজ্ঞা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন জগন্নাথপুর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পী বৃন্দ ছাড়াও আমন্ত্রীত শিল্পী চ্যানেল আই’র সেরা কন্ঠ শিল্পী সালমা, বাংলাদেশ আইডল তারকা শ্রাবণ কুমার জুয়েল, চ্যানেল আই’র সেরা কন্ঠ শিল্পী জগন্নাথপুরের  বুশরা আক্তার ঝুমু, বাউল শিল্পী  শাহ মো: হারুন মিয়া, শাহ্ মো. ছুরত মিয়া, কন্ঠ শিল্পী ফারাজানা আক্তার, শারমিন, ফয়ছল গনি শাহ্, ফোক শিল্পৗ সিপন আহমদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *