‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’র সদর দপ্তর গঠন নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ: বৈষম্য নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চায় এলাকাবাসী
- Update Time : ০৩:৪৩:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
- / 13

আয়াত উল্ল্যাহ, ঢাকা:
সর্বশেষ গণশুনানির প্রস্তাবনা অনুযায়ী সদ্য অনুমোদিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’র সদর দপ্তর নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী কোনো সুবিধাজনক স্থানে স্থাপনের জোর দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল ১১ জুলাই (শনিবার) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘উত্তর ফটিকছড়ি সচেতন নাগরিক সমাজ, ঢাকা’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষে তীব্র বৃষ্টি উপেক্ষা করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিশাল মানববন্ধনও পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে নবগঠিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’র সদর দপ্তর স্থাপন এবং সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অবহেলিত ও বঞ্চিত উত্তর ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষের দাবি উপেক্ষা করে, গণশুনানির রায় জালিয়াতির মাধ্যমে উপজেলা সদর দপ্তরকে পুনরায় দক্ষিণের অঞ্চলের দিকে স্থানান্তরের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উত্তর ফটিকছড়ির জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার গভীর ষড়যন্ত্র ও নীলনকশার অভিযোগ:
বক্তারা বলেন, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর ফটিকছড়ির মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার একটি সুনিপুণ নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তৎকালীন ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এবং স্থানীয় বাগানবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের যোগসাজশে ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের রেজুলেশন ও ম্যাপ জালিয়াতির মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, দলছুট ও স্বার্থান্বেষী আমলারা বর্তমান সরকারের আমলেও সেই একই প্রস্তাব সুকৌশলে পাস করানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজস্বের ৭০ ভাগ দিয়েও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত উত্তরাঞ্চল:
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাগানবাজার, দাঁতমারা ও নারায়ণহাট—এই তিনটি ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যেখানে প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বসবাস। কৃষি, চা শিল্প, রাবার শিল্প ও প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল থেকে পুরো ফটিকছড়ি উপজেলার মোট রাজস্বের প্রায় ৭০ শতাংশ অর্জিত হয়। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও এই অঞ্চল চরম অবহেলিত ও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে।
ভৌগোলিক ও দূরত্বের চরম অসঙ্গতি:
রামগড় বড়ু যৌথ উত্তরাঞ্চল থেকে বর্তমান প্রস্তাবিত সদরের দূরত্ব প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। অথচ ১ নম্বর সুয়াবিল ইউনিয়নকে এই নতুন উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বর্তমান ফটিকছড়ি সদর থেকে মাত্র ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বক্তারা বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে চিন্তা করলে সদর দপ্তরটি নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। এটি করা হলে উপজেলার সব এলাকার মানুষ সমানভাবে সুবিধা পাবে। তা না করে উত্তরাঞ্চল থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া মানুষের সাথে চরম উপহাস ও অভিনব প্রতারণা।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি:
এর আগে গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারকে ১ সপ্তাহের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না পাওয়ায় আজ ফটিকছড়ির সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছে বলে আন্দোলনকারীরা জানান।
নাগরিক সমাজের মূল দাবি সমূহ:
১.গণশুনানির প্রস্তাবনা ও ম্যাপ অনুযায়ী সর্বসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত উত্তর ফটিকছড়ির ভৌগোলিক মধ্যবর্তী স্থানে (নারায়ণহাট-দাঁতমারার মাঝামাঝি) ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’র সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে।
২.গণশুনানি অনুযায়ী প্রস্তুত করা ম্যাপ ও ক্যাবিনেট ফাইল তৎকালীন ইউএনও মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী কর্তৃক প্রস্তাবিত জালিয়াতির ম্যাপের সাথে মিলিয়ে যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। জালিয়াতির সত্যতা সাপেক্ষে উস্কানিদাতাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৩.এই সংকটের গভীর তদন্তের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
আপসহীন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি:
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, বর্তমান উত্তরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন এবং ১ নম্বর সুয়াবিল ইউনিয়নের ছাত্র, যুবসমাজসহ সর্বস্তরের জনগণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফটিকছড়ির সাধারণ মানুষ এটি মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়, তবে নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই আন্দোলন আরও তীব্র ও বেগবান রূপ নেবে।
তীব্র বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন:
সংবাদ সম্মেলন শেষে সমবেত জনতা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে তীব্র বৃষ্টি উপেক্ষা করে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে ভিজেই মানববন্ধনে অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই বৈষম্যমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অনতিবিলম্বে তৃণমূলের মানুষের অধিকার রক্ষায় ও সমস্যা সমাধানে তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সচেতন নাগরিক পরিষদের প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী উপস্থিত ছিলেন।



















