মো: আব্দুল হাই:
বিরহ: কারে দেখাব মনের দু:খ গো, বুক চিরিয়া, অন্তরে তুষেরি অনল জ্বলে গুইয়া গুইয়া। মান: পাষান মনরে বুঝাইয়ও চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লইও। ধামাইল: তোমরানি দেখিয়াছ শ্যামের মূখ ওগো সারি শুক, প্রেমানলে অঙ্গ জ্বলে ফাটিয়া যায় বুক।
বৈঞ্চব পদাবলির মহা রাজা মরমী সাধক কবি রাধারমন দত্তের ১০৩ তম প্রয়ান দিবস আজ শনিবার(১০ নভেম্বর)এ উপলক্ষ্যে জগন্নাথপুর পৌর শহরের কেশবপুর এলাকায় প্রতিষ্টিত রাধারমন সমাজ কল্যান সাংস্কৃতিক পরিষদের আয়োজনে ২দিন ব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়েছে।
আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্টানকে ঘীরে রাধারমণ দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কেশবপুর সহ পুরো উপজেলা ব্যাপী ভক্তদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও বিনোদন প্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। অনুষ্টানের আশে পাশে শিশুদের খেলনা সহ মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির বিভিন্ন দ্রব্যের মেলার ফসরা বসানো হয়েছে।
বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার একটি অন্যতম উপজেলা হচ্ছে জগন্নাথপুর। বাংলা মরমী সাহিত্যের অব্যাহত ধারায় এ উপজেলার অবদান অপরিসীম। সারা দেশের ন্যায় জগন্নাথপুরের বুকেও বহু পীর, দরবেশ, সাধু সাধক, সন্যাসী জন্ম গ্রহন করেছেন এবং তাদের বানীর মাধ্যমে পূন্য ভুমিতে পরিণত করেছেন।
সূফী সাধকগন তাদের স্ব স্ব ধারায় মরমী সাহিত্যের প্রচুর সম্পদ রেখে গেছেন। যা গবেষনার বিষয় হয়ে রয়েছে। তারা চিত্তবৃত্তের এই সূরময় ভুবনে পদচারনা করে নিজস্ব সৃষ্টি ধারায় মরমী সাহিত্যের যে অমিয় প্রবাহ বইয়ে দিয়েছিলেন তা আজও দেশের মাটি ও বাতাসে অপূর্ব ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে চলেছে।
উপমহাদেশের আত্মাধিকতা বা মরমী সাধনার মূল কেন্দ্র বিন্দুর স্্েরাত ধারা যদিও বাংলা এবং ভারতের বাইরেই জন্মলাভ করেছে কিন্তু পরবর্তীকালে এ সূফী ধারা ও মরমী বাদ বাংলার উর্বর শ্যামল জমিতেই বিকাশ লাভ করেছে আশ্চর্যজনক ভাবে।
সূফী সাধক সৈয়দ শাহ হোছন আলম, মরমী কবি সৈয়দ আসহর আলী চৌধুরী, সৈয়দ শাহনুর, রাধারমন, মুন্সি রহমতুল্লাহ, আছিম শাহ, কালু শাহ প্রমূখ আউল বাউলের বিচরন ভুমি জগন্নাথপুর এদের গান আজ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে মাটি ও মানুষের লোহিত কনায়।
মরমী কবি রাধারমন দত্ত জন্মগ্রহন করেন ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ বাংলা ১২৪০ সালে জগন্নাথপুর উপজেলার পৌর শহরের কেশবপুরে। তিনি রাধাকৃঞ্চ প্রেমতত্ত্ব বিষয়ক গান রচনা করে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ভারতের কাচার জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে এখনও অমর হয়ে রয়েছেন। রাধারমন হাছন রাজা থেকে বয়সে প্রায় ১৪/১৫ বছরের বড় ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে খুব হৃদ্যতা ছিল।
প্রবাদ রয়েছে যে, হাছন রাজা পত্র মারফত রাধারমনকে তার সুনামগঞ্জের তেঘরিয়াস্থ বাড়িতে দাওয়াত করেছিলেন। তিনি কবিতার ভাষায় আহবান করেছিলেন “রাধারমন আছো কেমন, হাছন রাজা জানতে চায়”। পত্র প্রাপ্তির পরে রাধারমন তার সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুুতি নিলেও কি একটা অসুবিদা ঘটায় হাছন রাজার সাথে মিলিত হতে না পেরে লিখেছিলেন “ গানের সেরা রাজা হাছন, পেলাম না তার চরন দর্শন, বিফলে দিন গেল গইয়া”।
অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের ভাষায় সিলেটের আকাশ বাতাস বাউল গানের সুরের দ্বারা যিনি আকুলিত ও ব্যকুলিত করেছিলেন তিনি হচ্ছেন জগন্নাথপুরের রাধারমন। রাধারমন সঙ্গীতের কয়েক খানা বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। মুন্সী আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতœ “রাধারমন সঙ্গীত” নামে ও সুনামগঞ্জের মরহুম আব্দুল হাই ভাইবে রাধারমন বলে বই প্রকাশ করেছেন।
প্রখ্যাত লোকতত্ত্ববিদ চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্য ভুষনের প্রায় চল্লিশ বছরের সংগ্রহের গানগুলো নিয়ে সিলেট মদনমোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদ একটি বই প্রকাশ করেন। এতে তিন শতাধিক গান স্থান পায়। রাধারমনের বেশকিছু গান বাংলা একাডেমীর সংগ্রহেও রয়েছে। সংগ্রাহকদের মতে রাধারমন সঙ্গীতের সংখ্যা ২/৩ সহ¯্রাধিক হবে। রাধারমন দত্ত শিল্পী, সুরকার ও একজন ভাল অভিনেতা ছিলেন বলে ইতিহাস সূত্রে জানাগেছে।
রাধারমন সম্পর্কে অনেক অলৌকিক কথাও লোক মূখে শোনা যায়। রাধারমন ভাবে বিভোর হয়ে গান রচনা করতেন। শিষ্যরা শুনে তা লিখে রাখতেন। তিনি তত্ত্বসঙ্গীত, দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, বিরহ, আক্ষেপ, মান, ধামাইল ইত্যাদি বিভিন্ন শাখার গান রচনা করতেন। বাংলার বধূ ও যুবতীদের কণ্ঠে বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্টানে এখনও ভাইবে রাধারমন বলে, ভনিতাযুক্ত ধামাইল গান শুনা যায়। তাছাড়া গ্রাম বাংলার হাটে-মাঠে মনের সূখে বা দু:খে অনেকেই উতলা মনে গান গেয়ে পথ চলতে দেখা যায়।
মাঝিরা মহানন্দে প্রেম বিরহের গানের সূর টানতে টানতে নৌকা চালায়। দেশের ভাটি অঞ্চল যেখানে বছরে প্রায় ৬ মাস থাকে জ্বলে টুই টুম্বুর সেখানকার চাষীদের যখনই অবকাশ মিলে তখনই জমিয়ে দেয় তারা বাউল গানের আসর। এসব গানের অধিকাংশই ‘ভাইবে রাধারমন বলে ভনিতাযুক্ত। বাংলাদেশ ও ভারতের বেতার ও টেলিভিশন রাধারমনের গান প্রায় সময় প্রচার করে আসছেন।
চলচিত্রেও রাধারমনের বেশ কিছু গান সংযোজিত হয়েছে। রাধারমন দত্তের সাধনা ছিল সহজিয়া বৈঞ্চন পদ্ধতি। সঙ্গীত ছিল তার সাধনার অন্তর্ভূক্ত। প্রায় ৩২বছর তিনি সাধনা করেছেন। রাধারমন দত্ত প্রায় ৮২বছর বয়সে ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ ১৩২২বাংলার ২৬ কার্তিক শুক্রবার শুক্লা জৈষ্টিতে মরদেহ ত্যাগ করেন। রাধা রমনের কয়েকটি গানের ধূয়া নি¤েœ
প্রদত্ত হলো:-
দেহতত্ত্ব:-(১) ভবনদীর ঢেউ দেখিয়া
দাড়াইয়া রইয়াছি কূলে
দয়াল গুরু পারকর
দীনহীন কাঙ্গালেরে।
(২) ওরে ও রসিক নাইয়া, ও সুজনও নাইয়া
ভব সাগর পাড়ি দেওরে বেলা যায়রে গুইয়া।
ভক্তিমূলক:- তোমার পাদপন্থে মজিয়া থাক
হরি হে আমার এই বাসনা।
আমি বাঞ্চা করি তোমায় হেরি
বংশীধারী কাল সোনা।
ভজন:- দয়াল গুরু বিনে বন্ধুকেহ নই এ সংসারে
দয়াল বন্ধু কৃপা সিন্ধু বিপন্ন অঞ্জন মূলাধার।
ভাই বন্ধু পরিবার কেবা সঙ্গে যায় কার
মরিতে মমতা নাই ত্বরায় করে ঘরের বার।
বিরহ :Ñ(১) ও প্রান বৃন্দে আমার প্রান যায় প্রান বন্ধু বিহনে
(২) সখী রাত্র হইল ভোর আইল না মোর প্রান প্রিয়া নিদয়া নিষ্টুর।
(৩) কারে দেখাব মনের দু:খ গো বুক চিরিয়া, অন্তরে তুষের অনল জ্বলে গুইয়া গুইয়া।
আপেক্ষ:-(১) প্রান সখী ললীতে কি জন্য আসিলাম আমি কুঞ্জতে।
(২) বন্ধের বাশি মন উদাসী করিল আমারে. নাম ধরিয়া বাজে বাঁিশ ঘরের দুয়ারে।
মান: পাষান মনরে বুঝাইয়ও চিনিয়া মানুষের সঙ্গ লইও
ধামাইল: তোমরানি দেখিয়াছ শ্যামের মূখ ওগো সারি শুক। প্রেমানলে অঙ্গ জ্বলে ফাটিয়া যায় বুক ।
জ.টুডে- বি ডি নাথ