মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান যুক্তরাজ্য :
আনন্দঘন পরিবেশ ও সৌহাদ্যের মধ্যদিয়ে লন্ডনে হয়ে গেল লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাথে হাইকমিশনারের সংলাপ ও জবাবদিহিতামূলক এজিএম ।
গত ২৮ জানুয়ারি ২০২০ পূর্ব লন্ডনের কমার্শিয়াল রোডের লন্ডন এন্টারপ্রাইজ একাডেমির হল রুমে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লারে সভাপতি মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জোবায়েরের পরিচালনায় লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিমের সাথে ‘ডায়লগ উইথ হাইকমিশনার‘ শীর্ষক মতবিনিময় ও এজিএম ২০১৯ নৈশভোজের মাধ্যমে কমিউনিটির বিশিস্ট ব্যক্তিবর্গ, প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য ও অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে ঝাঁকজমকপূর্নভাবে প্রেসক্লারের এ বার্ষিক সভা সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের এজিএম। প্রেসক্লাব সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জুবায়েরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের এক বৎসরের কর্মতৎপরতার উপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী। প্রেসক্লাবের সারাবছরের সামগ্রিক কর্মতৎপরতার উপর সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ জুবায়ের। বার্ষিক আর্থিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন প্রেসক্লাবের ট্রেজারার আ স ম মাসুম।
প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় পর্বে ডায়লগে প্রশ্ন -উত্তরের শুরুতেই যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার আশিকুন নবী চৌধুরী বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মিশনের বিভিন্ন খবর সুন্দর ও কার্যকরভাবে প্রচারের জন্য ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। পরে প্রায় ঘন্টাব্যাপী ডায়লগ পর্বে সভায় ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় মঞ্চে ক্লাবের সভাপতির উপস্থিতিতে যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। হাই কমিশনার তাঁর বক্তব্যে জানান, আসছে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে মুজিববর্ষ শুরু হচ্ছে এবং আগামী বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ হাই কমিশন লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক শহরগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
এর মধ্যে রয়েছে “মুজিব শতবর্ষ বিশেষ সেবা সপ্তাহ” সহ আরো অনেক পরিকল্পনা। তিনি বাংলাদেশের পর্যটন, স্টাট কার্ড, পার্সপোট বিষযয়ে বিভিন্ন তথ্য, বিমান, সোনালী ব্যাংক, যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রায়াত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের অবহিত করেন। পরে ডায়লগ পর্বে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
পূর্ব লন্ডনে বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে বিবিসির সাবেক সাংবাদিক উদয় শংকর দাসের এক প্রশ্নের উত্তরে হাইকমিশনার জানান- বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের এ বিষয়ে আমি একমত। তবে লন্ডনে বঙ্গবন্ধু সেন্টার বাস্তবায়নে আমরা অনেকটা এগিয়ে আছি। মার্চ ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু সেন্টারের ভিত্তি প্রস্তর রার পরিকল্পনায় এগুচ্ছি। তারপর আমার প্রচেষ্টা থাকবে ইস্টলন্ডনে বাংলা সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের আন্তরিক উদ্দোগ।
জানিনা আমার এ সময়ের ভিতরে করতে পারবো কিনা। বাংলাদেশের জবমার্কেট, নার্স বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে টিভি পেজেন্টার উর্মি মাযহারের প্রশ্নের জবাব দেন হাইকমিশনার। সাংবাদিকতায় নারীর আরো অংশ গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রাখেন মুনীরা পারভীন। সেভেনটি ওয়ান নিয়ে কুটনৈতিক তৎপরতা এ বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন টিভি পেজেন্টার বুলবুল হাসান।

বিলেতে কনসুলার সাভিসে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করেন সাপ্তাহিক বাংলা সংলাপের সাজু আহমেদ। ফেইলিং এন্ড সাকসেস বিষয়ে কথা বলেন এলবি২৪ এর মারুফ আহমেদ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান প্রসঙ্গে কুটনৈতিক প্রশ্ন করেন ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী। দেশে জমিজামা নিয়ে প্রবাসী হয়রানীর উত্তরণ নিয়ে প্রশ্ন রাখেন ৫২ বাংলার সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম অভি।
পর্যটন বিষয়ে সাংবাদিক ফারুক যোশী, বিমানের সমস্যা ও স্মার্ট কার্ড প্রাপ্তি নিয়ে জানতে চান দর্পণ সম্পাদক রহমত আলী। অন্যান্য বিষয়ে আরো অনেক উপস্থিত সাংবাদিক বৃন্দ হাইকমিশনারের কাছে প্রশ্নের মাধ্যমে সমাধান খুঁজেন। ডায়লগের এক পর্যায়ে ব্রিটিশ বাংলা নিউজের প্রধান সম্পাদক ও সাপ্তাহিক বাংলা সংলাপের সহকারী সম্পাদক মুহাম্মদ শাহেদ রাহমান লন্ডনে হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম কাছে প্রশ্ন করেন যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের স্টাট কার্ড প্রাপ্তি বিষয়ে এবং গ্রেটব্রিটেনে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে তথা বাংলাদেশ বিমান ও হাইকমিশনের সহযোগিতাতায় দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মুজিব জন্ম শতবর্ষ কে সামনে রেখে কোন সরকারের পরিকল্পনা আছে কিনা ? এ প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিম বলেন- প্রবাসীর স্মার্ট কার্ড প্রাপ্তি শীঘ্রই সূচনা হবে।
১২ ফেব্রæয়ারি ২০২০ প্রধান নির্বাচন কমিশন এখানে আসবেন। পরাক্ষামুলক শুরু হবে, তারপর আস্তে আস্তে এ সভা সবার কাছে পৌঁছে দেব। আর প্রবাসীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে পাঠানো বিষয়ে তথ্যগত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন- আইনগত ও অন্যান্য জটিলতার জন্য এ মুহুর্তে এরকম কোন পরিকল্পনা নেই বা সম্ভব হচ্ছেনা। হাইকমিশনের সেবার মান নিয়ে সাংবাদিকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাইকমিশনার জানান- হাই কমিশনের সেবার মান উন্নয়নে ইতোমধ্যেই ২৪ ঘন্টা মোবাইল ফোনের জরুরি হেলফ লাইন চালু করা হয়েছে।
যার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ মানুষকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা দেয়া হচ্ছে। ই-মেইলেও প্রতিদিন অনেক মানুষ হাই কমিশন থেকে তথ্য সেবা নিচ্ছেন। এছাড়া কনস্যুলার শাখায় ডেস্কটপ কম্পিউটার, ফটো সার্ভিস, ফটোকপি সার্ভিস ও ইলেক্ট্রনিক টোকেন সার্ভিস চালু করা হয়েছে। যার ফলে সেবা গ্রহিতারা আগের চেয়ে অনেক সহজে কনস্যুলার সেবা নিতে পারছেন।
সাঈদা মুনা তাসনিম আরও বলেন, “আমি একজন সরকারী কর্মকর্তা নয়, একজন সরকারী কর্মচারী হিসেবে কাজ করব।আমি প্রতিদিন অফিসে এসেই খোঁজ নেই কনসুলার অফিসে জনগণ কেমন সেবা পাচ্ছেন। আমি সেবাগ্রহিতাদের মধ্য থেকে রোজই দু-চারজনকে জিজ্ঞাস করি তাঁরা কেমন সেবা পাচ্ছেন। সবাই আমাকে খুবই উৎসাহের সাথে অবহিত করেন যে, তাঁরা খুব ভাল সেবা পাচ্ছেন।
তাঁদের কোন অভিযোগ নেই। হাইকমিশনার বলেন, লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের সার্ভিস অতীতের চেয়ে বহুগুণ ভালো করা হয়েছে। লন্ডন মিশন থেকে যেসব সেবা নিয়মিত দেয়া হয় এই বিশেষ সপ্তাহে সেগুলো স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্রæত দেয়া হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে নতুন পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়ন, বাংলাদেশি-ব্রিটিশদের এনভিআর ইস্যু, পাওয়ার অব এটর্নি সম্পাদন, জন্ম-নিবন্ধন এবং বাংলাদেশে জমিজমা সংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদান। সম্ভাব্যক্ষেত্রে কিছু কিছু সেবা তাৎক্ষণিক প্রদান করা হবে।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের দোরগোড়ায় এসব সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য লন্ডনের বাইরে বিভিন্ন শহরে এবং আয়ারল্যান্ডেও কনস্যুলার সেবার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। হাইকমিশনার সবাইকে অবহিত করে বলেন, বিগত এক বছরে লন্ডন মিশনে সব ধরনের সেবা প্রদানের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন পাসপোর্ট ইস্যুর হার বেড়েছে ৩২%, ভিসা ১২%, এনভিআর ৮%, বিভিন্ন ডকুমেন্ট সত্যায়নের হার ২২% ও জন্ম-নিবন্ধন ৬%। এসময়ে মোট ৫৬,১৩৬ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের সেবা দেয়া হয়েছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ১০% বেশি।