কৃষকদের নামে মামলা দিয়ে বদলি হলেন কৃষি কর্মকর্তা
- Update Time : ০৬:৩৬:৫৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 13

রুহুল আমিন রুকু, কুড়িগ্রাম থেকে:
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে বিক্ষোভকারী কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল জব্বারকে বদলি করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অফিস আদেশে তাকে ভূরুঙ্গামারী থেকে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়। তার স্থলে আদিতমারীর কৃষি কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুককে ভূরুঙ্গামারীতে পদায়ন করা হয়েছে। পূর্বে তার বদলির আদেশ হলেও প্রভাব খাটিয়ে বাতিল করে নেন কৃষি কর্মকর্তা। তিনি ৩ সেপ্টেম্বর ২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২৬ মোট ৩ বছর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন। রয়েছে তার বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ।
জানা যায়, ৭ সেপ্টেম্বর সোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় সারের দাবিতে কৃষকেরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ করা হয়। পরে তিনি বাদী হয়ে ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলা করেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মামলার পর এজাহারভুক্ত কৃষকদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন কৃষক বাড়িতে থাকছেন না বলেও জানা গেছে। কৃষকদের দাবি, তারা সরকারি কাজে বাধা বা কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করতে যাননি; সার সংকট ও নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার প্রতিবাদেই তারা বিক্ষোভ করেছেন। তারা প্রকৃত কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিতরণ এবং প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে নিরপরাধ কৃষকদের হয়রানি না করার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে বদলি করা হয়।
এছাড়া কৃষকরা কৃষি অফিস থেকে ঠিকমতো পরামর্শ না পাওয়ায় উপজেলার কৃষকগণ স্থানীয় বিভিন্ন দোকান থেকে দোকানদারের পরামর্শ অনুযায়ী সার, কীটনাশক ও বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করছেন। উৎপাদিত সেই ফসল বাজার থেকে ক্রয় করে শরীর ও জীবনের ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন করায় সাংবাদিকের ওপর চটে যান ওই কৃষি কর্মকর্তা।
তিনি বীজ বিতরণে প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যক্তি ও নেতাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া, ফসল ও শাক-সবজির প্রদর্শনী যথাযথভাবে না করা এবং এসব কার্যক্রমের নথি না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কীটনাশক ও সার ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র না থাকলেও সার দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। কোনো কোনো ডিলারের পয়েন্ট উপজেলা সদর থেকে ১০-১৫ কিলোমিটার দূরে হলেও সার সদর এলাকার গুদামে এনে সেখান থেকে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া কৃষি কর্মকর্তার নিয়মিত অফিস না করা এবং বিভিন্ন কৃষি-সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে সুবিধা নেওয়া, কৃষি ভবনের হলরুম ভাড়া দিয়ে নিজের তহবিলে টাকা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
প্রায় এক বছর আগে অক্টোবর/২৫ একটি ধান রোপণ/কাটা কৃষিযন্ত্র বিতরণ নিয়েও অভিযোগ ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এর দায় শুধুমাত্র উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ওপর চাপানো হয় এবং পরে তাকে বদলি করে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করা হয়। গোপন সূত্রে জানা যায়, তিনি বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়ায় অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো সখ্যতা রয়েছে। সেই সহানুভূতি থেকেই তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন।
কয়েক মাস আগে তার সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হলে তিনি জানান, তার বদলির একটি আদেশ হয়েছিল, পরে তা বাতিল করে নেন। সে সময় কৃষি দপ্তরের মাধ্যমে এক বছরে কৃষকদের জন্য সরকারি ও কোনো প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে, কী কী কৃষিযন্ত্র বিতরণ, কোন কোন কৃষকদের প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং এতে কতজন কৃষক উপকৃত হয়েছেন—এসব তথ্য ও নথি চাওয়া হলে তিনি দেবেন না বলে জানান সাংবাদিকদের। পরে সাংবাদিকরা তার কক্ষ থেকে নিচে নেমে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার নিকট কৃষি বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে কৃষি কর্মকর্তা নিচে আসলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং একপর্যায়ে ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিনকে ফোন করে বলেন, এখানে তথ্য চাইতে এসেছে, তাদের ধরে নিয়ে যান। পরে থানার ওসি তাকে তথ্য দেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে সাংবাদিকদ্বয় ঘটনাস্থল থেকে চলে আসেন।
কৃষি কর্মকর্তা দীর্ঘদিন উপজেলায় দায়িত্বে থাকায়, যাকে মনে চেয়েছেন সুবিধা দিয়েছেন, আবার যাকে মনে চেয়েছেন জরিমানা করেছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া তিনি কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা হওয়ায় সঠিকভাবে তথ্য যাচাই না করে একপাক্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। যেখানে একজন কর্মচারী আইডিতে বয়স জালিয়াতি করলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। তাই কৃষকদের নাম ভাঙিয়ে যেন সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা লুটপাট না হয়, সরকারি বরাদ্দ ও প্রকল্পের অর্থ যেন যথাযথভাবে কৃষকদের উন্নয়নে ব্যবহার করা হয় এবং অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়—এমন দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নেটিজেনরা।



















