১০:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আন্তর্জাতিক বসতি দিবস: সবার জন্য হোক নিরাপদ আবাসন

  • Update Time : ১০:২১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / 1

 

মো: আব্দুল আজিজ

আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান। একটি নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয় ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক জীবনবিকাশ অসম্ভব। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক বসতি দিবস। এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পার হওয়ার পরও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা একটি দূরূহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবে দেশের আবাসন সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। অথচ সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতা বা অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা দুবাইয়ের মতো দেশগুলো আজ আবাসন ও নগর পরিকল্পনায় বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই বৈপরীত্য আমাদের নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর কাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
সাংবিধানিক অধিকার ও বর্তমান বাস্তবতা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ, আজও মানসম্মত এবং নিরাপদ আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে বস্তি ও অননুমোদিত উপায়ে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত বসতিগুলোর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এসব স্থানে বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিশুদ্ধ খাবার পানি, উন্নত স্যানিটেশন বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো কোনো মৌলিক নাগরিক সুবিধাই নেই। উচ্চ বাড়িভাড়া এবং ভূমির আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় আবাসনের পেছনে, যা তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অন্যান্য অতিপ্রয়োজনীয় খাতের খরচকে সংকুচিত করে তোলে।
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা
আমাদের দেশে নগর পরিকল্পনা ও আবাসন নিশ্চিত করার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও আমরা এই সংস্থাগুলোকে একটি আধুনিক, গতিশীল ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সরকারি এসব সংস্থা প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট বা দীর্ঘমেয়াদি আবাসন প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে তাদের দৃশ্যমান উদ্যোগ অত্যন্ত নগণ্য। এর পাশাপাশি রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, মাস্টারপ্ল্যানের সঠিক বাস্তবায়নের অভাব এবং আধুনিক প্রকৌশলগত দূরদর্শিতার অনুপস্থিতি। ফলে শহরগুলো দিন দিন বাসযোগ্যতা হারিয়ে এক একটি কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সফল মডেল: সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দুবাই
আমরা যদি আমাদের সমসাময়িক বা পরবর্তী সময়ে উন্নত হওয়া দেশগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাবো কীভাবে সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একটি দেশের আবাসন চিত্রকে বদলে দিতে পারে।
১. সিঙ্গাপুর মডেল: ১৯৬০-এর দশকে সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশটি ছিল বস্তি আর অপরিকল্পিত বসতিতে ভরা এক জরাজীর্ণ দ্বীপ। কিন্তু তৎকালীন দূরদর্শী নেতা লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ (এইচডিবি)। এই বোর্ডের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করা। সিঙ্গাপুর সরকার কঠোর ভূমি আইন প্রণয়ন করে এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করে নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে ক্রয়ের সুযোগ করে দেয়। আজ সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এইচডিবির তৈরি করা ফ্ল্যাটে বসবাস করে, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা আবাসন মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
২. মালয়েশিয়া মডেল: মালয়েশিয়া তাদের ‘ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি’ বা জাতীয় আবাসন নীতির মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তারা ‘প্রোগ্রাম পারুমাহান রকিয়াত’ (পিপিআর) বা পিপলস হাউজিং প্রোগ্রামের আওতায় অত্যন্ত কম মূল্যে আরামদায়ক ফ্ল্যাট সরবরাহ করে। মালয়েশিয়ার আবাসন পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে উপশহর গড়ে তোলা এবং সেখানে দ্রুতগতির গণপরিবহন ও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, যার ফলে মূল শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমে যায়।
৩. দুবাই মডেল: মরুভূমির একটি সাধারণ অঞ্চল থেকে মাত্র কয়েক দশকে দুবাই আজ আধুনিক স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার বিশ্বকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ের নগর কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর আইন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে শহরটিকে সাজিয়েছে। সেখানে প্রতিটি আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত পার্ক, বাণিজ্যিক জোন এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা আগে থেকেই নিশ্চিত করা হয়। দুবাইয়ের এই দ্রুত ও পরিকল্পিত রূপান্তর প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব।
নিরাপদ ও আরামদায়ক কমদামের আবাসনের প্রয়োজনীয়তা
একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক আবাসন শুধু মাথার ওপর একটি ছাদ নয়; এটি মানুষের কর্মদক্ষতা, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যখন একজন নাগরিক সাশ্রয়ী মূল্যে একটি ভালো পরিবেশে বাস করার সুযোগ পান, তখন তার জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। বিশেষ করে শিশুদের সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য আলো-বাতাসপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। কমদামে বা সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে এর গুণগত মান খারাপ হবে। আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি, টেকসই উপাদান এবং পরিবেশবান্ধব নকশার মাধ্যমে কম খরচেও অত্যন্ত আরামদায়ক ও ভূমিকম্প-সহনশীল বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব, যা আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
আবাসন সংকটের মূল কারণসমূহ
বাংলাদেশে এই তীব্র আবাসন সংকটের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
অতিমাত্রায় কেন্দ্রিকতা: আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই অতিরিক্ত ঢাকা-কেন্দ্রিকতার কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ গ্রামীণ অঞ্চল ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যা আবাসন ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
ভূমির উচ্চমূল্য: অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আবাসন খাতের কিছু অসাধু চক্রের কারণে শহরাঞ্চলে জমির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অভাব: নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহনির্মাণ ঋণের সুবিধা অত্যন্ত সীমিত।
সমন্বয়ের অভাব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর (ওয়াসা, ডেসকো, তিতাস ইত্যাদি) মধ্যে কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বয় নেই।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
স্বাধীনতার এত বছর পর আমাদের আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের আবাসন খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহের সংস্কার: রাজউকসহ দেশের সকল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক মানসিকতা পরিহার করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা।
বিকেন্দ্রীকরণ ও উপশহর নির্মাণ: ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমাতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আধুনিক নাগরিক সুবিধা সংবলিত উপশহর বা সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে মানুষ নিজ নিজ এলাকাতেই আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
ব্লকভিত্তিক ও খাড়া আবাসন (ঠবৎঃরপধষ ঐড়ঁংরহম): আমাদের কৃষিজমি রক্ষা করতে অনুভূমিক আবাসনের পরিবর্তে খাড়া বা বহুতল বিশিষ্ট আবাসন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বহুতল বিশিষ্ট সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
সহজ শর্তে গৃহঋণ প্রবর্তন: সিঙ্গাপুরের সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ড (ঈচঋ) মডেলের মতো আমাদের দেশেও একটি বিশেষ গৃহায়ন তহবিল বা ‘শেল্টার ফান্ড’ গঠন করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদে আবাসন ঋণ পাবেন।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (চচচ): আবাসন সংকট দূর করতে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ী ও ডেভেলপারদের যুক্ত করে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সবার জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার। আন্তর্জাতিক বসতি দিবসে আমাদের এই অঙ্গীকার করতে হবে যে, দেশের একজন মানুষও যেন আশ্রয়হীন না থাকে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা দুবাই যদি শূন্য থেকে শুরু করে আজ পৃথিবীর বুকে পরিকল্পিত ও উন্নত নগরীর উদাহরণ হতে পারে, তবে সঠিক নীতি, সৎ নেতৃত্ব এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশও তা করতে সক্ষম। আমাদের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে জবাবদিহিতা ও আধুনিকতার আলোয় সাজিয়ে তুলতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যেতে পারি।

লেখক: গবেষক, সমাজচিন্তক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।

Please Share This Post in Your Social Media

আন্তর্জাতিক বসতি দিবস: সবার জন্য হোক নিরাপদ আবাসন

Update Time : ১০:২১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

 

মো: আব্দুল আজিজ

আবাসন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান। একটি নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয় ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক জীবনবিকাশ অসম্ভব। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক বসতি দিবস। এই দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পার হওয়ার পরও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা একটি দূরূহ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবে দেশের আবাসন সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। অথচ সমসাময়িক সময়ে স্বাধীনতা বা অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা দুবাইয়ের মতো দেশগুলো আজ আবাসন ও নগর পরিকল্পনায় বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই বৈপরীত্য আমাদের নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর কাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
সাংবিধানিক অধিকার ও বর্তমান বাস্তবতা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ, আজও মানসম্মত এবং নিরাপদ আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে বস্তি ও অননুমোদিত উপায়ে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত বসতিগুলোর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এসব স্থানে বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিশুদ্ধ খাবার পানি, উন্নত স্যানিটেশন বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো কোনো মৌলিক নাগরিক সুবিধাই নেই। উচ্চ বাড়িভাড়া এবং ভূমির আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় আবাসনের পেছনে, যা তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অন্যান্য অতিপ্রয়োজনীয় খাতের খরচকে সংকুচিত করে তোলে।
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা
আমাদের দেশে নগর পরিকল্পনা ও আবাসন নিশ্চিত করার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও আমরা এই সংস্থাগুলোকে একটি আধুনিক, গতিশীল ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো তাদের বাণিজ্যিক মানসিকতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সরকারি এসব সংস্থা প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ফ্ল্যাট বা দীর্ঘমেয়াদি আবাসন প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে তাদের দৃশ্যমান উদ্যোগ অত্যন্ত নগণ্য। এর পাশাপাশি রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, মাস্টারপ্ল্যানের সঠিক বাস্তবায়নের অভাব এবং আধুনিক প্রকৌশলগত দূরদর্শিতার অনুপস্থিতি। ফলে শহরগুলো দিন দিন বাসযোগ্যতা হারিয়ে এক একটি কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সফল মডেল: সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও দুবাই
আমরা যদি আমাদের সমসাময়িক বা পরবর্তী সময়ে উন্নত হওয়া দেশগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাবো কীভাবে সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা একটি দেশের আবাসন চিত্রকে বদলে দিতে পারে।
১. সিঙ্গাপুর মডেল: ১৯৬০-এর দশকে সিঙ্গাপুর যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশটি ছিল বস্তি আর অপরিকল্পিত বসতিতে ভরা এক জরাজীর্ণ দ্বীপ। কিন্তু তৎকালীন দূরদর্শী নেতা লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ (এইচডিবি)। এই বোর্ডের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের জন্য নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করা। সিঙ্গাপুর সরকার কঠোর ভূমি আইন প্রণয়ন করে এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বহুতল বিশিষ্ট আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করে নাগরিকদের দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে ক্রয়ের সুযোগ করে দেয়। আজ সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ এইচডিবির তৈরি করা ফ্ল্যাটে বসবাস করে, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা আবাসন মডেল হিসেবে স্বীকৃত।
২. মালয়েশিয়া মডেল: মালয়েশিয়া তাদের ‘ন্যাশনাল হাউজিং পলিসি’ বা জাতীয় আবাসন নীতির মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তারা ‘প্রোগ্রাম পারুমাহান রকিয়াত’ (পিপিআর) বা পিপলস হাউজিং প্রোগ্রামের আওতায় অত্যন্ত কম মূল্যে আরামদায়ক ফ্ল্যাট সরবরাহ করে। মালয়েশিয়ার আবাসন পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্য হলো শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে উপশহর গড়ে তোলা এবং সেখানে দ্রুতগতির গণপরিবহন ও সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, যার ফলে মূল শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ কমে যায়।
৩. দুবাই মডেল: মরুভূমির একটি সাধারণ অঞ্চল থেকে মাত্র কয়েক দশকে দুবাই আজ আধুনিক স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার বিশ্বকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ের নগর কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর আইন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে শহরটিকে সাজিয়েছে। সেখানে প্রতিটি আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত পার্ক, বাণিজ্যিক জোন এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা আগে থেকেই নিশ্চিত করা হয়। দুবাইয়ের এই দ্রুত ও পরিকল্পিত রূপান্তর প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিকেও জয় করা সম্ভব।
নিরাপদ ও আরামদায়ক কমদামের আবাসনের প্রয়োজনীয়তা
একটি নিরাপদ ও আরামদায়ক আবাসন শুধু মাথার ওপর একটি ছাদ নয়; এটি মানুষের কর্মদক্ষতা, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যখন একজন নাগরিক সাশ্রয়ী মূল্যে একটি ভালো পরিবেশে বাস করার সুযোগ পান, তখন তার জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারেন। বিশেষ করে শিশুদের সঠিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য আলো-বাতাসপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি। কমদামে বা সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে এর গুণগত মান খারাপ হবে। আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি, টেকসই উপাদান এবং পরিবেশবান্ধব নকশার মাধ্যমে কম খরচেও অত্যন্ত আরামদায়ক ও ভূমিকম্প-সহনশীল বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব, যা আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।
আবাসন সংকটের মূল কারণসমূহ
বাংলাদেশে এই তীব্র আবাসন সংকটের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:
অতিমাত্রায় কেন্দ্রিকতা: আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও ব্যবসার প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই অতিরিক্ত ঢাকা-কেন্দ্রিকতার কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ গ্রামীণ অঞ্চল ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যা আবাসন ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
ভূমির উচ্চমূল্য: অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আবাসন খাতের কিছু অসাধু চক্রের কারণে শহরাঞ্চলে জমির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অভাব: নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহনির্মাণ ঋণের সুবিধা অত্যন্ত সীমিত।
সমন্বয়ের অভাব: গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর (ওয়াসা, ডেসকো, তিতাস ইত্যাদি) মধ্যে কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বয় নেই।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
স্বাধীনতার এত বছর পর আমাদের আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার মতো সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের আবাসন খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসমূহের সংস্কার: রাজউকসহ দেশের সকল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক মানসিকতা পরিহার করে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন নিশ্চিত করা।
বিকেন্দ্রীকরণ ও উপশহর নির্মাণ: ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমাতে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় আধুনিক নাগরিক সুবিধা সংবলিত উপশহর বা সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে মানুষ নিজ নিজ এলাকাতেই আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।
ব্লকভিত্তিক ও খাড়া আবাসন (ঠবৎঃরপধষ ঐড়ঁংরহম): আমাদের কৃষিজমি রক্ষা করতে অনুভূমিক আবাসনের পরিবর্তে খাড়া বা বহুতল বিশিষ্ট আবাসন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বহুতল বিশিষ্ট সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।
সহজ শর্তে গৃহঋণ প্রবর্তন: সিঙ্গাপুরের সেন্ট্রাল প্রভিডেন্ট ফান্ড (ঈচঋ) মডেলের মতো আমাদের দেশেও একটি বিশেষ গৃহায়ন তহবিল বা ‘শেল্টার ফান্ড’ গঠন করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকেরা দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদে আবাসন ঋণ পাবেন।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (চচচ): আবাসন সংকট দূর করতে সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন ব্যবসায়ী ও ডেভেলপারদের যুক্ত করে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সবার জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার। আন্তর্জাতিক বসতি দিবসে আমাদের এই অঙ্গীকার করতে হবে যে, দেশের একজন মানুষও যেন আশ্রয়হীন না থাকে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা দুবাই যদি শূন্য থেকে শুরু করে আজ পৃথিবীর বুকে পরিকল্পিত ও উন্নত নগরীর উদাহরণ হতে পারে, তবে সঠিক নীতি, সৎ নেতৃত্ব এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশও তা করতে সক্ষম। আমাদের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে জবাবদিহিতা ও আধুনিকতার আলোয় সাজিয়ে তুলতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ রেখে যেতে পারি।

লেখক: গবেষক, সমাজচিন্তক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।