০৩:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্রাবণ মেঘের ঘনঘটা

  • Update Time : ০৩:৫৯:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / 17

মাধুরী ব্যানার্জী, কবি ও কথা সাহিত্যিক

শ্রাবণের প্রথম বিকেল। আকাশজুড়ে কালো মেঘের রাজত্ব। দূরের তালগাছগুলো বারবার মাথা নুইয়ে জানিয়ে দিচ্ছে—আজ বৃষ্টি নামবেই। গ্রামের শেষ প্রান্তের ছোট্ট কাঁচা বাড়িটির বারান্দায় বসে ছিল মেঘলা। তার হাতে পুরোনো একটি ডায়েরি, যার প্রতিটি পাতায় জমে আছে কিছু না-পাঠানো চিঠি।
এই বাড়িতে একসময় হাসির শব্দ ছিল। বাবা ছিলেন গ্রামের স্কুলশিক্ষক, মা গান গাইতেন। কিন্তু সময়ের ঝড় সবকিছু বদলে দিয়েছে। বাবা চলে গেছেন বহু বছর আগে, আর মা গত শ্রাবণেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। তারপর থেকে শ্রাবণ মানেই মেঘলার কাছে বিষণ্নতার অন্য নাম।
হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ যেন হাজারো অশ্রুর একসঙ্গে ঝরে পড়া। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
দেখল, ভিজে এক কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটি বই।
—”দিদি, স্কুলের লাইব্রেরি থেকে এনেছি। মাস্টারমশাই বলেছিলেন, আপনি পড়তে ভালোবাসেন।”
মেঘলা বিস্মিত হলো। বাবার ছাত্রদের কেউ কেউ এখনও তাঁর কথা মনে রেখেছে! ছেলেটিকে ভেতরে ডেকে শুকনো কাপড় দিল, গরম চা বানিয়ে দিল। কথায় কথায় জানল, গ্রামের অনেক শিশুই বইয়ের অভাবে পড়তে পারে না।
সেদিন রাতেই মেঘলা সিদ্ধান্ত নিল। বাবার রেখে যাওয়া হাজারো বই ধুলোয় পড়ে থাকবে না। বাড়ির সামনের ঘরটিকেই বানিয়ে ফেলল ছোট্ট একটি পাঠাগার।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ঘর ভরে উঠল শিশুদের কোলাহলে। কেউ কবিতা পড়ে, কেউ গল্প শোনে, কেউ নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে। মেঘলা বুঝল—শোককে আঁকড়ে ধরে রাখলে জীবন থেমে যায়, কিন্তু তাকে মানুষের কল্যাণে রূপ দিলে সে আলো হয়ে ফিরে আসে।
পরের শ্রাবণে আবার মেঘ জমল। আবার বৃষ্টি নামল। কিন্তু এবার সেই বৃষ্টির শব্দ আর একাকিত্বের কান্না নয়; যেন শিশুদের হাসি, বইয়ের পাতার মৃদু উল্টে যাওয়া, আর নতুন স্বপ্নের সুর।
মেঘলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “শ্রাবণের মেঘ শুধু ঝড় আনে না, কখনও কখনও মানুষের হৃদয়ে নতুন ঋতুরও জন্ম দেয়।”
সেদিন গ্রামের মানুষ দেখেছিল—মেঘের ঘনঘটার আড়ালেও সূর্যের আলো লুকিয়ে থাকে। শুধু অপেক্ষা করতে জানতে হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

শ্রাবণ মেঘের ঘনঘটা

Update Time : ০৩:৫৯:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

মাধুরী ব্যানার্জী, কবি ও কথা সাহিত্যিক

শ্রাবণের প্রথম বিকেল। আকাশজুড়ে কালো মেঘের রাজত্ব। দূরের তালগাছগুলো বারবার মাথা নুইয়ে জানিয়ে দিচ্ছে—আজ বৃষ্টি নামবেই। গ্রামের শেষ প্রান্তের ছোট্ট কাঁচা বাড়িটির বারান্দায় বসে ছিল মেঘলা। তার হাতে পুরোনো একটি ডায়েরি, যার প্রতিটি পাতায় জমে আছে কিছু না-পাঠানো চিঠি।
এই বাড়িতে একসময় হাসির শব্দ ছিল। বাবা ছিলেন গ্রামের স্কুলশিক্ষক, মা গান গাইতেন। কিন্তু সময়ের ঝড় সবকিছু বদলে দিয়েছে। বাবা চলে গেছেন বহু বছর আগে, আর মা গত শ্রাবণেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। তারপর থেকে শ্রাবণ মানেই মেঘলার কাছে বিষণ্নতার অন্য নাম।
হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ যেন হাজারো অশ্রুর একসঙ্গে ঝরে পড়া। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
দেখল, ভিজে এক কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটি বই।
—”দিদি, স্কুলের লাইব্রেরি থেকে এনেছি। মাস্টারমশাই বলেছিলেন, আপনি পড়তে ভালোবাসেন।”
মেঘলা বিস্মিত হলো। বাবার ছাত্রদের কেউ কেউ এখনও তাঁর কথা মনে রেখেছে! ছেলেটিকে ভেতরে ডেকে শুকনো কাপড় দিল, গরম চা বানিয়ে দিল। কথায় কথায় জানল, গ্রামের অনেক শিশুই বইয়ের অভাবে পড়তে পারে না।
সেদিন রাতেই মেঘলা সিদ্ধান্ত নিল। বাবার রেখে যাওয়া হাজারো বই ধুলোয় পড়ে থাকবে না। বাড়ির সামনের ঘরটিকেই বানিয়ে ফেলল ছোট্ট একটি পাঠাগার।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই ঘর ভরে উঠল শিশুদের কোলাহলে। কেউ কবিতা পড়ে, কেউ গল্প শোনে, কেউ নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে। মেঘলা বুঝল—শোককে আঁকড়ে ধরে রাখলে জীবন থেমে যায়, কিন্তু তাকে মানুষের কল্যাণে রূপ দিলে সে আলো হয়ে ফিরে আসে।
পরের শ্রাবণে আবার মেঘ জমল। আবার বৃষ্টি নামল। কিন্তু এবার সেই বৃষ্টির শব্দ আর একাকিত্বের কান্না নয়; যেন শিশুদের হাসি, বইয়ের পাতার মৃদু উল্টে যাওয়া, আর নতুন স্বপ্নের সুর।
মেঘলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “শ্রাবণের মেঘ শুধু ঝড় আনে না, কখনও কখনও মানুষের হৃদয়ে নতুন ঋতুরও জন্ম দেয়।”
সেদিন গ্রামের মানুষ দেখেছিল—মেঘের ঘনঘটার আড়ালেও সূর্যের আলো লুকিয়ে থাকে। শুধু অপেক্ষা করতে জানতে হয়।