সিলেটে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ
- Update Time : ১০:০৬:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
- / 11

মুফিজুর রহমান নাহিদ, সিলেট:
সিলেট নগরের রায়নগরে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জেরে তাঁর প্রেমিক বাবুল মিয়া একাই তিনজনকে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বাবুল মিয়ার স্বীকারোক্তিমতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ তবে ছুরিটি পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরের রায়নগর মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় খুন হন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)।
সকালে প্রতিবেশীরা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে বিষয়টি সন্দেহ করেন। পরে ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজার তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে। এটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধ; এমন একাধিক সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম ঘটনাস্থলে গিয়ে জানান, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন মোটিভ সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটনে তিনি একটি বিশেষ তদন্তের শুরুতেই পুলিশ বাসার আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লাল টি-শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা এক ব্যক্তিকে সন্দেহ হয় তদন্তকারীদের। এরপর তাঁর পরিচয় শনাক্তে শুরু হয় অনুসন্ধান।
স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যেই রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে নূর মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করতে সমর্থ হয় পুলিশ।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বাবুল মিয়া তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে দিয়েছে বলে পুলিশকে জানায় বাবুল মিয়া। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতেই ওই বাসায় যায় বাবুল। তাহমিনার সম্মতিতেই সে বাসায় প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বাবুল তাহমিনার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। তাহমিনা তাতে রাজি না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ বাধে বলে পুলিশের কাছে বাবুল জানিয়েছে। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তাহমিনার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম। তখন তাঁকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। এরপর ধস্তাধস্তি ও চিৎকারের শব্দ শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
তিনজনকে হত্যার পর ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে বাসার বেলকনি দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় বাবুল। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি পরে বাসার পাশের জঙ্গলাকীর্ণ একটি মাঠে ফেলে দেয়। এরপরও সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়নি; বরং রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিল।হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন আতঙ্ক ও নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল, তখনই তদন্তে গতি আনে সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য। সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি অনুসরণ করে মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ।
নগরীর সোবাহনীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) শিপলু চৌধুরী জানিয়েছেন, বাবুল মিয়া পেশায় রঙ মিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করত। কসাইয়ের কাজের সুবাদে তার কাছে থাকা ছুরিটিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
রায়নগরের এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনটি প্রাণের এমন নির্মম পরিণতি নগরজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যে বাসায় একটি পরিবার নিশ্চিন্তে দিন কাটাত, সেই বাসাতেই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে থেমে গেছে তিনটি জীবন। একজন গৃহকর্মীর প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা থেকে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে মুহূর্তেই তিনটি প্রাণ কেড়ে নিল; তা এখন সিলেটবাসীর কাছে এক গভীর বেদনার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।



















