০১:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পদ্মাপাড়ের দিনগুলি– লেখক: আফসানা মিমি সুইটি

  • Update Time : ০৮:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
  • / 12

শীতের ঘন কুয়াশা আর পিঠার আমেজে চারদিক যখন উৎসব মুখর, ঠিক এমন একটা সময়ে নাকি স্কুলে যেতে হবে!
ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ, আজ বছরের শেষ দিন। আজই মিনুর তৃতীয় শ্রেণির ফলাফল দেয়ার কথা। ফলাফল নিয়ে যদিও মিনুর কোন মাথা ব্যাথা নাই। মিনুর মা সকাল থেকেই বাড়ি মাথায় করেছে৷ বারবার তাড়া দিচ্ছে স্কুলে যাবার জন্য। মিনুর পড়াশুনা মোটেও ভালো লাগেনা। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে কি শান্তিতেই না সে দিনাতিপাত করছিলো। প্রতিদিন সকাল হয় বাবার সাথে ভাপা পিঠা খেতে বের হয় আর সাথে খেঁজুর রস। মতির মায়ের বানানো সেই পিঠার স্বাদ অতুলনীয়।

তারপর শুরু হয় তার পুতুল আর হাঁড়ি – পাতিল খেলা। আজ বাড়িতে যুদ্ধ শুরু হলেও কোনওমতেই স্কুলে যাওয়া যাবে না। কারণ, আসমার পুতুলের সাথে আজ তার পুতুলের বিয়ে হবে। এ উপলক্ষে, লতিফা, সালমা ওদেরকেও দাওয়াত দিয়েছে। খাবার মেনুতে থাকবে বাটা বিস্কুটের ক্ষীর, চানাচুর আর সবচেয়ে পছন্দের ২ টাকা দামের প্যাকেটের লিচু। এসব কেনার জন্য মিনু ৩ দিন পিঠা না খেয়ে টাকা জমিয়েছে। এসব মেনু ঠিক করতে সাহায্য করেছে রিমা আপু। রিমা আপু হলো বাড়িওয়ালার ভাইয়ের মেয়ে। রিমা আপু খুব ভালোবাসে মিনুকে। মিনু খুব চঞ্চল আর বাচাল স্বভাবের হওয়ায় সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। বিয়েটা ভালোই ভালোই শেষ হলো। আজ খুব মজা হয়েছে।

জোহরের আযান হচ্ছে। খেলা আজকের মতো শেষ। মিনু খুব ভয় পাচ্ছে। সে খুব ভালো মতো জানে যে, আজ বাড়িতে গেলে তার একটা হাড্ডিও আস্তো থাকবে না। রিমা আপুর কাছে শুনেছিলো, মানুষের নাকি ২০৬ টা হাড্ডি থাকে। আচ্ছা মা আজ আমার কয়টা হাড্ডি ভাঙবে! ২০৬ টা হাড্ডির মধ্যে ০৬ টাও যদি ভেঙে যায় আরও ২০০ টা হাড্ডি থাকবে। এটা ভেবেই মিনু ফিক করে হেসে দিলো।

বাড়িতে ঢুকতেই মিনু দেখলো বড় মামা এসেছে। বড় মামাকে দেখে মিনু খুব খুশি হয়। কারণ, মামার সামনে মা তাকে কিছুই বলবে না। এটা ভাবতেই মিনুর ভালো লাগছে, ২০৬ টা হাড্ডিই তার থেকে যাবে।

পরদিন বিকালবেলা মিনু আসমাকে সাথে নিয়ে নদীতে ঘুরতে যায়। শীতকাল মানেই নদীতে চর পরে যায়। আর চর পরা মানেই খুব সুন্দর মতো নদী পার হয়ে ওপারে যাওয়া যায়। আসমা ভয় পেলেও মিনুর খুবই ভালো লাগে। জীবনের প্রথম সে নদীর পাড়ে উঠেছে। মিনু শুনেছিলো নদী পার হয়ে ভারত যাওয়া যায়। আজ যেভাবেই হোক ভারত যাবেই। দুইজন মিলে অনেকটা পথ হাঁটতে থাকে কিন্তু বালি আর শক্ত মাটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। একটা সময় পর চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। এইবার মিনু সত্যি সত্যি ভয় পেতে শুরু করে। এই বিপদে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎই তার মনে হয় নানা বলেছিলো বিপদে দুআ ইউনুস পড়তে (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন)।
এদিকে মিনুর মা দেখে মিনু এখনও বাড়ি আসে নি। আসমা,লতিফা, সালমা সবার বাড়িতেই যায়। কিন্তু, কোথাও মিনুকে পাওয়া যায় না। আসমার মা বলে বিকালের দিকে মিনু আর আসমা বের হয়েছিলো তারপর আর কেউ তাদের দেখতে পায়নি।
অবশেষে, মিনু চর পেরিয়ে বাড়ির গেইটের সামনে চলে আসে। কিন্তু, সাহস হয়নি বাড়ির ভেতরে যাবার। মিনুর বাবা বাড়ি আসে আর গেইটের সামনে দেখে মিনু দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। বাবা বলে উঠে কি হয়েছে মিনু? এই মিনু, কথা বল?
কিন্তু সে কথা না বলেই ওখানে পরে যায়।
রাত থেকেই মিনুর জ্বর আসে।আর সে বলতে থাকে, মা আর কখনও তোমার অবাধ্য হবো না। আজ থেকে যা বলবা সব শুনবো।
এভাবে প্রায় ১০ দিন পার হয়ে যায়। স্কুল আর যাওয়া হয় না। একদিন হঠাৎ করেই মিনুর বাবা এসে বলে, তাকে বদলি করা হয়েছে। কালই তাদের চট্টগ্রাম চলে যেতে হবে। বাবা সরকারি চাকরি করেন এই সুবাদে প্রায়ই তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়।
মিনুর এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে যে, তাকে আর স্কুলে যেতে হবে না। ম্যাডামদের হাত থেকে অন্তত রক্ষা পেলো সে। কিন্তু, লতিফা, আসমা,সালমা ওদের সাথে আর কখনও দেখা হবে না। এটা ভাবলেই বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠছে। কেনো এমন হচ্ছে?
ট্রাকে সব জিনিসগুলো উঠানো হয়। তারপর তারাও ট্রাকে উঠে পরে। একসময় ট্রাক চলতে শুরু করে।পদ্মানদী ক্রমশ দূরে যেতে থাকে। হঠাৎই আর নদী দেখা যায় না। চোখের কোণে মিনুর পানি জমতে থাকে,হঠাৎই মিনু ডুকরে কেঁদে উঠে আর বলে মা আমি থাকতে চাই। তোমরা আমাকে নিয়ে যেও না….

Please Share This Post in Your Social Media

পদ্মাপাড়ের দিনগুলি– লেখক: আফসানা মিমি সুইটি

Update Time : ০৮:৪৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

শীতের ঘন কুয়াশা আর পিঠার আমেজে চারদিক যখন উৎসব মুখর, ঠিক এমন একটা সময়ে নাকি স্কুলে যেতে হবে!
ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ, আজ বছরের শেষ দিন। আজই মিনুর তৃতীয় শ্রেণির ফলাফল দেয়ার কথা। ফলাফল নিয়ে যদিও মিনুর কোন মাথা ব্যাথা নাই। মিনুর মা সকাল থেকেই বাড়ি মাথায় করেছে৷ বারবার তাড়া দিচ্ছে স্কুলে যাবার জন্য। মিনুর পড়াশুনা মোটেও ভালো লাগেনা। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে কি শান্তিতেই না সে দিনাতিপাত করছিলো। প্রতিদিন সকাল হয় বাবার সাথে ভাপা পিঠা খেতে বের হয় আর সাথে খেঁজুর রস। মতির মায়ের বানানো সেই পিঠার স্বাদ অতুলনীয়।

তারপর শুরু হয় তার পুতুল আর হাঁড়ি – পাতিল খেলা। আজ বাড়িতে যুদ্ধ শুরু হলেও কোনওমতেই স্কুলে যাওয়া যাবে না। কারণ, আসমার পুতুলের সাথে আজ তার পুতুলের বিয়ে হবে। এ উপলক্ষে, লতিফা, সালমা ওদেরকেও দাওয়াত দিয়েছে। খাবার মেনুতে থাকবে বাটা বিস্কুটের ক্ষীর, চানাচুর আর সবচেয়ে পছন্দের ২ টাকা দামের প্যাকেটের লিচু। এসব কেনার জন্য মিনু ৩ দিন পিঠা না খেয়ে টাকা জমিয়েছে। এসব মেনু ঠিক করতে সাহায্য করেছে রিমা আপু। রিমা আপু হলো বাড়িওয়ালার ভাইয়ের মেয়ে। রিমা আপু খুব ভালোবাসে মিনুকে। মিনু খুব চঞ্চল আর বাচাল স্বভাবের হওয়ায় সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। বিয়েটা ভালোই ভালোই শেষ হলো। আজ খুব মজা হয়েছে।

জোহরের আযান হচ্ছে। খেলা আজকের মতো শেষ। মিনু খুব ভয় পাচ্ছে। সে খুব ভালো মতো জানে যে, আজ বাড়িতে গেলে তার একটা হাড্ডিও আস্তো থাকবে না। রিমা আপুর কাছে শুনেছিলো, মানুষের নাকি ২০৬ টা হাড্ডি থাকে। আচ্ছা মা আজ আমার কয়টা হাড্ডি ভাঙবে! ২০৬ টা হাড্ডির মধ্যে ০৬ টাও যদি ভেঙে যায় আরও ২০০ টা হাড্ডি থাকবে। এটা ভেবেই মিনু ফিক করে হেসে দিলো।

বাড়িতে ঢুকতেই মিনু দেখলো বড় মামা এসেছে। বড় মামাকে দেখে মিনু খুব খুশি হয়। কারণ, মামার সামনে মা তাকে কিছুই বলবে না। এটা ভাবতেই মিনুর ভালো লাগছে, ২০৬ টা হাড্ডিই তার থেকে যাবে।

পরদিন বিকালবেলা মিনু আসমাকে সাথে নিয়ে নদীতে ঘুরতে যায়। শীতকাল মানেই নদীতে চর পরে যায়। আর চর পরা মানেই খুব সুন্দর মতো নদী পার হয়ে ওপারে যাওয়া যায়। আসমা ভয় পেলেও মিনুর খুবই ভালো লাগে। জীবনের প্রথম সে নদীর পাড়ে উঠেছে। মিনু শুনেছিলো নদী পার হয়ে ভারত যাওয়া যায়। আজ যেভাবেই হোক ভারত যাবেই। দুইজন মিলে অনেকটা পথ হাঁটতে থাকে কিন্তু বালি আর শক্ত মাটি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। একটা সময় পর চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। এইবার মিনু সত্যি সত্যি ভয় পেতে শুরু করে। এই বিপদে কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎই তার মনে হয় নানা বলেছিলো বিপদে দুআ ইউনুস পড়তে (লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জোয়ালেমিন)।
এদিকে মিনুর মা দেখে মিনু এখনও বাড়ি আসে নি। আসমা,লতিফা, সালমা সবার বাড়িতেই যায়। কিন্তু, কোথাও মিনুকে পাওয়া যায় না। আসমার মা বলে বিকালের দিকে মিনু আর আসমা বের হয়েছিলো তারপর আর কেউ তাদের দেখতে পায়নি।
অবশেষে, মিনু চর পেরিয়ে বাড়ির গেইটের সামনে চলে আসে। কিন্তু, সাহস হয়নি বাড়ির ভেতরে যাবার। মিনুর বাবা বাড়ি আসে আর গেইটের সামনে দেখে মিনু দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। বাবা বলে উঠে কি হয়েছে মিনু? এই মিনু, কথা বল?
কিন্তু সে কথা না বলেই ওখানে পরে যায়।
রাত থেকেই মিনুর জ্বর আসে।আর সে বলতে থাকে, মা আর কখনও তোমার অবাধ্য হবো না। আজ থেকে যা বলবা সব শুনবো।
এভাবে প্রায় ১০ দিন পার হয়ে যায়। স্কুল আর যাওয়া হয় না। একদিন হঠাৎ করেই মিনুর বাবা এসে বলে, তাকে বদলি করা হয়েছে। কালই তাদের চট্টগ্রাম চলে যেতে হবে। বাবা সরকারি চাকরি করেন এই সুবাদে প্রায়ই তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হয়।
মিনুর এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে যে, তাকে আর স্কুলে যেতে হবে না। ম্যাডামদের হাত থেকে অন্তত রক্ষা পেলো সে। কিন্তু, লতিফা, আসমা,সালমা ওদের সাথে আর কখনও দেখা হবে না। এটা ভাবলেই বুকের ভিতরটা কেমন যেনো করে উঠছে। কেনো এমন হচ্ছে?
ট্রাকে সব জিনিসগুলো উঠানো হয়। তারপর তারাও ট্রাকে উঠে পরে। একসময় ট্রাক চলতে শুরু করে।পদ্মানদী ক্রমশ দূরে যেতে থাকে। হঠাৎই আর নদী দেখা যায় না। চোখের কোণে মিনুর পানি জমতে থাকে,হঠাৎই মিনু ডুকরে কেঁদে উঠে আর বলে মা আমি থাকতে চাই। তোমরা আমাকে নিয়ে যেও না….