শিক্ষক- শিক্ষার্থীর মেলবন্ধনই হোক নৈতিক সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি
- Update Time : ১০:৪৩:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 10

মো: আব্দুল আজিজ
মানবসভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত যে কটি পেশা সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছে, তার মধ্যে শিক্ষকতা সর্বশ্রেষ্ঠ। শিক্ষক কেবল অক্ষরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন; তিনি মানুষের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার কারিগর। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে শিক্ষকদের ‘মাথার তাজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকের স্থান। পিতা-মাতা সন্তানকে জন্ম দিয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন, আর শিক্ষক সেই সন্তানকে নৈতিক ও জাগতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই শাশ্বত ও পবিত্র সম্পর্কে কোথাও কোথাও চির ধরছে। বর্তমান যুগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত এবং শিক্ষকদের গুরুদায়িত্ব কী—তা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনার সময় এসেছে।
শিক্ষকগণ মাথার তাজ ও তাঁদের মর্যাদা
ইসলাম ধর্মসহ পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম এবং দর্শনে শিক্ষককে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকগণ হলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বাতিঘর। তাঁদের মর্যাদা অন্য যেকোনো পেশাজীবীর চেয়ে ঊর্ধ্বে। সমাজ গঠনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। একজন আদর্শ শিক্ষক নিজের স্বার্থ, আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তাঁর বিখ্যাত ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতায় দিল্লির বাদশাহ আলমগীরের মাধ্যমে শিক্ষকের যে উচ্চ মর্যাদা ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা আজীবন সর্বজনীন সত্য। বাদশাহ তাঁর পুত্রকে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এই কারণে যে, পুত্র কেন নিজের হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিল না। একজন সম্রাট হয়েও শিক্ষকের চরণে মাথা নত করতে দ্বিধা করেননি বাদশাহ আলমগীর। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, শিক্ষকের স্থান সব রাজকীয় ক্ষমতার চেয়েও ওপরে। শিক্ষকগণ সমাজের বিবেক, তাঁদের সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
শিক্ষকদের মনে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি
শিক্ষকের মন অবহেলা বা অসম্মানে ভেঙে গেলে তার প্রভাব পুরো সমাজ ও জাতির ওপর পড়ে। শিক্ষককে কষ্ট দেওয়া মানে জ্ঞানের প্রদীপকে নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো, শিক্ষকের অসন্তুষ্টি বা অভিশাপ শিক্ষার্থীর জীবনকে অন্ধকারচ্ছন্ন করে তোলে। আধ্যাত্মিক দিক বাদ দিলেও, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে এটি চরম সত্য। যে শিক্ষার্থী তার গুরু বা শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতে পারে না, সে কখনো প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। বর্তমান সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, তুচ্ছ কারণে বা রাজনৈতিক প্রভাবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছে, তাঁদের মনে আঘাত দিচ্ছে। এটি একটি চরম অবক্ষয়ের লক্ষণ। শিক্ষকের মনে কষ্ট দিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, অনৈতিকতা এবং অবাধ্যতার জন্ম হয়। যে জাতি তার শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে না, সে জাতির পতন অনিবার্য। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাঁদের মনে যাতে কোনো আঘাত না লাগে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।
দলমত নির্বিশেষে শিক্ষকদের নিরপেক্ষতা
একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তাঁর নিরপেক্ষতা। শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেন না। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর একজন শিক্ষকের একমাত্র পরিচয়—তিনি একজন ‘গুরু’ বা ‘মেন্টর’। তাঁর সামনে বসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবারের হতে পারে, ভিন্ন ধর্ম বা বর্ণের হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকের দৃষ্টিতে সবাই সমান। বর্তমান সময়ে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষক যদি দলমত বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করেন, তবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। একজন আদর্শ শিক্ষকের উচিত নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বা সামাজিক বিশ্বাসকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে রেখে আসা এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ ও ভালোবাসা দেওয়া।
সব ছাত্রকে নিজের সন্তান মনে করার মহত্ত্ব
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কেবল পেশাগত নয়, এটি একটি আত্মিক সম্পর্ক। একজন শিক্ষকের উচিত প্রত্যেকটা ছাত্রকে নিজের সন্তান মনে করা। পিতা-মাতা যেভাবে সন্তানের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে তাকে সুপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, শিক্ষকের ভূমিকাও ঠিক তেমনই হওয়া উচিত। সন্তান ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে; কিন্তু পিতা-মাতা যেমন তাকে ত্যাগ করেন না, শিক্ষকও তেমনি স্নেহের পরশ দিয়ে তাকে সংশোধন করবেন। যখন একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসবেন, তখন শিক্ষার পরিবেশ আমূল বদলে যাবে। শিক্ষার্থীরা তখন শিক্ষকের প্রতি ভয়ের পরিবর্তে এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অনুভব করবে। এই স্নেহের বন্ধন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং তাদের মনের নেতিবাচক প্রবণতাগুলো দূর করতে সাহায্য করে।
নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা প্রদানে শিক্ষকের ভূমিকা
আজকের দিনে জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফলের পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য—অর্থাৎ ‘নৈতিকতা’ হারিয়ে ফেলছি। পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান বা তাত্ত্বিক শিক্ষা মানুষকে বড় চাকরি এনে দিতে পারে, কিন্তু ভালো মানুষ বানাতে পারে না। এখানেই শিক্ষকের আসল ভূমিকা। শিক্ষককে কেবল সিলেবাস শেষ করার দায়িত্ব নিলে চলবে না, বরং পাঠের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, সততা, দেশপ্রেম, পরোপকারিতা এবং সহনশীলতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকের নিজের জীবনই হবে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় পাঠ্যবই। শিক্ষকের আচার-ব্যবহার, কথা বলা এবং সততা দেখে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হবে। শিক্ষক যখন একজন ছাত্রকে সন্তানের মতো স্নেহ দিয়ে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝিয়ে দেবেন, তখন সেই ছাত্র কখনো সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজে লিপ্ত হতে পারবে না।
আধুনিক যুগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের সংকট ও উত্তরণ
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়, ফলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করে শিক্ষকের আর তেমন প্রয়োজন নেই। এই ভুল ধারণার কারণে শিক্ষকদের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধের অভাব দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রে ‘পণ্য’ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ‘ক্রেতা-বিক্রেতার’ সম্পর্কে রূপ নিচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আবার সেই প্রাচীন শাশ্বত মূল্যবোধে ফিরে যেতে হবে। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে হবে যে, গুগল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য দিতে পারে, কিন্তু জীবন গড়ার ‘জ্ঞান’ এবং ‘আদর্শ’ কেবল একজন শিক্ষকের জীবন্ত সান্নিধ্য থেকেই পাওয়া সম্ভব। শিক্ষকদেরও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা সমৃদ্ধ করতে হবে, যাতে তাঁরা শিক্ষার্থীদের সঠিক পথ দেখাতে পারেন।
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষক ও ছাত্রের যৌথ দায়িত্ব
একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনে শিক্ষক ও ছাত্র উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে যে, শিক্ষকের আদেশ-নিষেধের পেছনে কোনো শত্রুতা নেই, বরং রয়েছে তাদের ভবিষ্যতের কল্যাণ। তাই শিক্ষকের যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনা বা শাসনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে, শিক্ষকদের মনে রাখতে হবে যে, আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক বা শিক্ষক। তাই তাদের মনে কোনো প্রকার ক্ষোভ বা হীনম্মন্যতা তৈরি হতে দেওয়া যাবে না। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে যখন শিক্ষকেরা পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটাবেন এবং শিক্ষার্থীরাও বিনম্র শ্রদ্ধায় তা গ্রহণ করবে, তখনই দেশে একটি আদর্শ ও শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিক্ষকগণ সত্যিই আমাদের সমাজের মাথার তাজ। তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করা কোনো করুণা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ। একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করাই যথেষ্ট—এটি ইতিহাস স্বীকৃত। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে শিক্ষকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা সচ্ছল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন। একই সাথে, শিক্ষকদেরও নিজেদের পদের গরিমা ও পবিত্রতা ধরে রাখতে হবে। দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসার যে উদাত্ত আহ্বান, তা যদি শিক্ষকেরা মনেপ্রাণে ধারণ করেন, তবে আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো আবার পবিত্র জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই মেলবন্ধনই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর পৃথিবী গড়ার মূল ভিত্তি।
লেখক: গবেষক, সমাজচিন্তক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, চেয়ারম্যান- ন্যাশনাল এনভারনমেন্ট এন্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।



















