কটিয়াদীতে পাঁচ শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকের বাজার
- Update Time : ০১:০০:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 13
রতন ঘোষ, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
হাটের চারদিকে শুধুই ঢাকিদের মহড়া। কোথাও ঢাকের আওয়াজ, কোথাও ঢাকের তালের সঙ্গে মিশেছে ঢোল, সানাই, বাঁশির সুর। নানা বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুরে ভিন্ন রকম উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে এই হাটে। স্থানীয়ভাবে এই ব্যতিক্রমী হাটের নাম “ঢাকের হাট”। প্রতিবছর দুর্গাপূজার আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসে এই হাট।
বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই হাট শেষ হবে শুক্রবার সন্ধ্যায়।
কথিত আছে, ষোড়শ শতাব্দীতে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের চাড়িপাড়া গ্রামে ছিল ওই রাজার প্রাসাদ। তখন পূজায় ঢাক-ঢোল, বাঁশিসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অংশ নিতে বিক্রমপুরে (মুন্সিগঞ্জ) বাদ্যকরদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সময় নৌপথে অসংখ্য ঢাকি ও বাদক দল আসেন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে উপজেলার মসুয়া ইউনিয়নের যাত্রাঘাট নামক স্থানে। রাজা নিজে সবার বাজনা শুনে বেছে নেন সেরা দলটিকে। সেই থেকেই এখানে ঢাকের হাট শুরু।
পরবর্তীতে পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন জমিদারদের মধ্যে হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অবশেষে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তন করে কটিয়াদী পুরাতন বাজারে গড়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী এই ঢাকের হাট।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় পাঁচশত বছর ধরে চলে আসা এটি কেবল হাট নয়, এই অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ঢাক ছাড়া হিন্দুদের দুর্গাপূজা অসম্পূর্ণ থাকে। মহাষষ্ঠী থেকে বিসর্জন সর্বক্ষেত্রেই চাই ঢাকের আওয়াজ। তাই পূজার সময় ঢাক-ঢোলের কদর বেড়ে যায়। জীবিকার টানে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকি ও বাদকরা আসেন এই হাটে। তাদের ভাড়া করে নিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পূজার আয়োজকরাও আসেন।
যদিও নামে ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক বা বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। বাদকরা অর্থের বিনিময়ে পূজা চলাকালীন বাজানোর জন্য আয়োজকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে ২০ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকার ওপরে নির্ধারিত হয় তাদের চুক্তিমূল্য।
১৪ অক্টোবর বিকেল থেকে ঢাকিরা আসতে শুরু করেন। ১৫ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, দুর্গাপূজার আগেই ঢাকের হাটে উৎসবের সুর। শত শত বাদ্যযন্ত্রের বোলে মুখরিত আকাশ-বাতাস। বাদকরা একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঢাক-ঢোল, ড্রাম, বাঁশি, সানাই, ঝনঝনিসহ বাহারি বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন। আর আয়োজকরা যাচাই করে দরদাম করছেন।
দোহার-নবাবগঞ্জ থেকে তিনজনের একটি বাদক দলের নেতা হয়ে হাটে এসেছেন বিনয় রায়। তিনি জানান, এবার পূজা বেশি হওয়ায় চাহিদাও বেড়েছে। কেউ কেউ ৫০ হাজার টাকা বললেও তারা ৮০-৯০ হাজার টাকার কমে যাবেন না।
কিশোরগঞ্জ সদর থেকে সাতজনের দল নিয়ে এসেছেন মোহাম্মদ রুকন। তিনি বলেন, এটি তার মূল পেশা নয়, শখ আর বাড়তি আয়ের জন্য করেন।
নরসিংদীর মনোহরদী থেকে আটজনের দল নিয়ে আসা ফারুক মিয়া জানান, এক যুগ ধরে এই হাটে আসেন। তার দলের জন্য কেউ কেউ এক লাখ টাকা বললেও তারা দেড় লাখের কমে যাবেন না।
নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে বায়না করতে আসা উৎপল কুমার বলেন, এই হাটে শত শত ঢাকি ও বাদকদের একসঙ্গে পাওয়া যায় এবং বাজনা পরখ করে নেওয়া যায়।
এই হাট চলবে ১৬ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত।
উল্লেখ্য, এখানে ঢাকিদের আবাসন ব্যবস্থা আজও অসমাপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক হাট বসায় ঢাকিদের পুরাতন বাজার থেকে সরে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী শ্রীশ্রী লক্ষ্মী নারায়ণ জীওর আখড়া প্রাঙ্গণ ও প্রয়াত রামদয়াল ঘোষের বাড়ির প্রাঙ্গণে।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, “এই ঢাকের হাটটি কটিয়াদীর একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। আমরা দ্রুতই আবাসনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করব।” ঢাকিদের জন্য একটি মানসম্মত টয়লেট নির্মাণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কর্মসূচির আওতায় টেস্ট রিলিফ খাত থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ঢাকের হাটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আবাসনের অসমাপ্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।



















