১০:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন অবান্তর ও আত্মমর্যাদার চরম হানিকর

  • Update Time : ০৩:৫০:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
  • / 18

ফারহানা ইসলাম রিমা
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পুরুষের পিছনেপিছনে ঘুরে কিংবা পুরুষেল করুনার পাত্রহয়ে অনেকেই মাননীয় এমপিও হয়েছেন। আমি মনে করি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর ।
নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গভিত্তিক অধিকার নয়, এটি যোগ্যতা, মেধা এবং দূরদর্শিতার ফসল। আধুনিক যুগে নারীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন। তবে, সমাজে এখনও এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যেখানে নারী নেতৃত্বকে পুরুষের ‘অনুকম্পা’ বা ‘দান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালে অনেক সময় নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয় উদারতা দেখিয়ে। কিন্তু পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর এবং এটি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।
করুণা বনাম অধিকার
যখন একজন নারী তার মেধা ও যোগ্যতার বলে নেতৃত্বের আসনে বসেন, তখন তা তার অধিকার ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি। কিন্তু সমাজ যখন তাকে অনুগ্রহ হিসেবে কোনো পদ বা দায়িত্ব প্রদান করে, তখন তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। করুণার পাত্র হওয়ার অর্থ হলো—নারী তার অস্তিত্বের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা নারীর আত্মমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে এবং তাকে পুরুষের অধীনস্থ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
ক্ষমতায়নের অন্তরায়
পুরুষের দয়ায় পরিচালিত নেতৃত্ব কখনও স্বাধীন হতে পারে না। করুণার মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই পুরুষতন্ত্রকে তুষ্ট রাখা, যার ফলে নারী তার নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এটি নারীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন সমতা ও পারস্পরিক সম্মান, যা করুণার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
নেতৃত্বের মূল ভিত্তি: যোগ্যতা ও সমতা
নারীর নেতৃত্ব বিকাশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার নিজস্ব দক্ষতা, শিক্ষা, ও সাহস। পুরুষের করুণা নয়, বরং সমাজে সমঅধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করাই নারী নেতৃত্বের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যখন নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান, কেবল তখনই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দেওয়া হয়।

নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষায় করুণার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন:
মানসিকতার পরিবর্তন: সমাজকে নারী নেতৃত্বকে ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে না দেখে ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
নারীর আত্মনির্ভরশীলতা: অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে।
অধিকার সচেতনতা: নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং কোনো ধরনের অনুগ্রহ গ্রহণ না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।
সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হওয়ার জন্য পুরুষ নেতাদের পেছনে ঘোরা বা তোষামোদ করার বাধ্যবাধকতা সত্যিই আমাদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গ্লানিবোধের। প্রত্যক্ষ ভোটের বদলে শুধুমাত্র মনোনয়ন বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হচ্ছে।
এই চরম বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বা সংসদীয় আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আইনি ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা। সেই সাথে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং সাধারণ নির্বাচনে নিজ দায়িত্বে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন প্রদানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক তদবির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

পুরুষের করুণা বা আনুকূল্য কোনো স্থায়ী নেতৃত্বের পথ হতে পারে না। নারী নেতৃত্ব তখনই সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ হবে, যখন তা কোনো করুণার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে, সমতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিকশিত হবে। নারীর আত্মমর্যাদা ও প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে করুণার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখকঃ কবি, নারীনেত্রী, ডিরেক্টর নারী টিভি ও সহসভাপতি জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ ।
পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন অবান্তর ও আত্মমর্যাদার চরম হানিকর
ফারহানা ইসলাম রিমা

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পুরুষের পিছনেপিছনে ঘুরে কিংবা পুরুষেল করুনার পাত্রহয়ে অনেকেই মাননীয় এমপিও হয়েছেন। আমি মনে করি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর ।
নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গভিত্তিক অধিকার নয়, এটি যোগ্যতা, মেধা এবং দূরদর্শিতার ফসল। আধুনিক যুগে নারীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন। তবে, সমাজে এখনও এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যেখানে নারী নেতৃত্বকে পুরুষের ‘অনুকম্পা’ বা ‘দান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালে অনেক সময় নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয় উদারতা দেখিয়ে। কিন্তু পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর এবং এটি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।
করুণা বনাম অধিকার
যখন একজন নারী তার মেধা ও যোগ্যতার বলে নেতৃত্বের আসনে বসেন, তখন তা তার অধিকার ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি। কিন্তু সমাজ যখন তাকে অনুগ্রহ হিসেবে কোনো পদ বা দায়িত্ব প্রদান করে, তখন তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। করুণার পাত্র হওয়ার অর্থ হলো—নারী তার অস্তিত্বের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা নারীর আত্মমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে এবং তাকে পুরুষের অধীনস্থ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
ক্ষমতায়নের অন্তরায়
পুরুষের দয়ায় পরিচালিত নেতৃত্ব কখনও স্বাধীন হতে পারে না। করুণার মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই পুরুষতন্ত্রকে তুষ্ট রাখা, যার ফলে নারী তার নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এটি নারীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন সমতা ও পারস্পরিক সম্মান, যা করুণার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
নেতৃত্বের মূল ভিত্তি: যোগ্যতা ও সমতা
নারীর নেতৃত্ব বিকাশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার নিজস্ব দক্ষতা, শিক্ষা, ও সাহস। পুরুষের করুণা নয়, বরং সমাজে সমঅধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করাই নারী নেতৃত্বের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যখন নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান, কেবল তখনই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দেওয়া হয়।

নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষায় করুণার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন:
মানসিকতার পরিবর্তন: সমাজকে নারী নেতৃত্বকে ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে না দেখে ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
নারীর আত্মনির্ভরশীলতা: অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে।
অধিকার সচেতনতা: নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং কোনো ধরনের অনুগ্রহ গ্রহণ না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।
সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হওয়ার জন্য পুরুষ নেতাদের পেছনে ঘোরা বা তোষামোদ করার বাধ্যবাধকতা সত্যিই আমাদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গ্লানিবোধের। প্রত্যক্ষ ভোটের বদলে শুধুমাত্র মনোনয়ন বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হচ্ছে।
এই চরম বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বা সংসদীয় আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আইনি ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা। সেই সাথে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং সাধারণ নির্বাচনে নিজ দায়িত্বে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন প্রদানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক তদবির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

পুরুষের করুণা বা আনুকূল্য কোনো স্থায়ী নেতৃত্বের পথ হতে পারে না। নারী নেতৃত্ব তখনই সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ হবে, যখন তা কোনো করুণার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে, সমতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিকশিত হবে। নারীর আত্মমর্যাদা ও প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে করুণার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

লেখকঃ কবি, নারীনেত্রী, ডিরেক্টর নারী টিভি ও সহসভাপতি জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ।

Please Share This Post in Your Social Media

পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন অবান্তর ও আত্মমর্যাদার চরম হানিকর

Update Time : ০৩:৫০:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

ফারহানা ইসলাম রিমা
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পুরুষের পিছনেপিছনে ঘুরে কিংবা পুরুষেল করুনার পাত্রহয়ে অনেকেই মাননীয় এমপিও হয়েছেন। আমি মনে করি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর ।
নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গভিত্তিক অধিকার নয়, এটি যোগ্যতা, মেধা এবং দূরদর্শিতার ফসল। আধুনিক যুগে নারীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন। তবে, সমাজে এখনও এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যেখানে নারী নেতৃত্বকে পুরুষের ‘অনুকম্পা’ বা ‘দান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালে অনেক সময় নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয় উদারতা দেখিয়ে। কিন্তু পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর এবং এটি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।
করুণা বনাম অধিকার
যখন একজন নারী তার মেধা ও যোগ্যতার বলে নেতৃত্বের আসনে বসেন, তখন তা তার অধিকার ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি। কিন্তু সমাজ যখন তাকে অনুগ্রহ হিসেবে কোনো পদ বা দায়িত্ব প্রদান করে, তখন তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। করুণার পাত্র হওয়ার অর্থ হলো—নারী তার অস্তিত্বের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা নারীর আত্মমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে এবং তাকে পুরুষের অধীনস্থ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
ক্ষমতায়নের অন্তরায়
পুরুষের দয়ায় পরিচালিত নেতৃত্ব কখনও স্বাধীন হতে পারে না। করুণার মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই পুরুষতন্ত্রকে তুষ্ট রাখা, যার ফলে নারী তার নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এটি নারীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন সমতা ও পারস্পরিক সম্মান, যা করুণার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
নেতৃত্বের মূল ভিত্তি: যোগ্যতা ও সমতা
নারীর নেতৃত্ব বিকাশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার নিজস্ব দক্ষতা, শিক্ষা, ও সাহস। পুরুষের করুণা নয়, বরং সমাজে সমঅধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করাই নারী নেতৃত্বের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যখন নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান, কেবল তখনই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দেওয়া হয়।

নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষায় করুণার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন:
মানসিকতার পরিবর্তন: সমাজকে নারী নেতৃত্বকে ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে না দেখে ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
নারীর আত্মনির্ভরশীলতা: অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে।
অধিকার সচেতনতা: নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং কোনো ধরনের অনুগ্রহ গ্রহণ না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।
সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হওয়ার জন্য পুরুষ নেতাদের পেছনে ঘোরা বা তোষামোদ করার বাধ্যবাধকতা সত্যিই আমাদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গ্লানিবোধের। প্রত্যক্ষ ভোটের বদলে শুধুমাত্র মনোনয়ন বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হচ্ছে।
এই চরম বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বা সংসদীয় আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আইনি ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা। সেই সাথে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং সাধারণ নির্বাচনে নিজ দায়িত্বে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন প্রদানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক তদবির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

পুরুষের করুণা বা আনুকূল্য কোনো স্থায়ী নেতৃত্বের পথ হতে পারে না। নারী নেতৃত্ব তখনই সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ হবে, যখন তা কোনো করুণার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে, সমতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিকশিত হবে। নারীর আত্মমর্যাদা ও প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে করুণার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখকঃ কবি, নারীনেত্রী, ডিরেক্টর নারী টিভি ও সহসভাপতি জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ ।
পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন অবান্তর ও আত্মমর্যাদার চরম হানিকর
ফারহানা ইসলাম রিমা

বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। পুরুষের পিছনেপিছনে ঘুরে কিংবা পুরুষেল করুনার পাত্রহয়ে অনেকেই মাননীয় এমপিও হয়েছেন। আমি মনে করি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারীদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর ।
নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গভিত্তিক অধিকার নয়, এটি যোগ্যতা, মেধা এবং দূরদর্শিতার ফসল। আধুনিক যুগে নারীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছেন। তবে, সমাজে এখনও এমন কিছু দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, যেখানে নারী নেতৃত্বকে পুরুষের ‘অনুকম্পা’ বা ‘দান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পুরুষতন্ত্রের বেড়াজালে অনেক সময় নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হয় উদারতা দেখিয়ে। কিন্তু পুরুষের করুণার পাত্র হয়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ আত্মমর্যাদার চরম হানিকর এবং এটি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে প্রধান অন্তরায়।
করুণা বনাম অধিকার
যখন একজন নারী তার মেধা ও যোগ্যতার বলে নেতৃত্বের আসনে বসেন, তখন তা তার অধিকার ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি। কিন্তু সমাজ যখন তাকে অনুগ্রহ হিসেবে কোনো পদ বা দায়িত্ব প্রদান করে, তখন তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। করুণার পাত্র হওয়ার অর্থ হলো—নারী তার অস্তিত্বের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা নারীর আত্মমর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে এবং তাকে পুরুষের অধীনস্থ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
ক্ষমতায়নের অন্তরায়
পুরুষের দয়ায় পরিচালিত নেতৃত্ব কখনও স্বাধীন হতে পারে না। করুণার মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্বের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় সেই পুরুষতন্ত্রকে তুষ্ট রাখা, যার ফলে নারী তার নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। এটি নারীর ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের বিকাশকে রুদ্ধ করে দেয়। সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন সমতা ও পারস্পরিক সম্মান, যা করুণার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।
নেতৃত্বের মূল ভিত্তি: যোগ্যতা ও সমতা
নারীর নেতৃত্ব বিকাশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত তার নিজস্ব দক্ষতা, শিক্ষা, ও সাহস। পুরুষের করুণা নয়, বরং সমাজে সমঅধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করাই নারী নেতৃত্বের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যখন নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সমাজের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান, কেবল তখনই তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা দেওয়া হয়।

নারীর আত্মমর্যাদা রক্ষায় করুণার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন:
মানসিকতার পরিবর্তন: সমাজকে নারী নেতৃত্বকে ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে না দেখে ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
নারীর আত্মনির্ভরশীলতা: অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে।
অধিকার সচেতনতা: নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং কোনো ধরনের অনুগ্রহ গ্রহণ না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে হবে।
সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি হওয়ার জন্য পুরুষ নেতাদের পেছনে ঘোরা বা তোষামোদ করার বাধ্যবাধকতা সত্যিই আমাদের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গ্লানিবোধের। প্রত্যক্ষ ভোটের বদলে শুধুমাত্র মনোনয়ন বা সমঝোতার ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অনেকটাই খর্ব হচ্ছে।
এই চরম বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বা সংসদীয় আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আইনি ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা। সেই সাথে সব রাজনৈতিক দলকে তাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবং সাধারণ নির্বাচনে নিজ দায়িত্বে নারীদের সরাসরি মনোনয়ন প্রদানে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক তদবির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

পুরুষের করুণা বা আনুকূল্য কোনো স্থায়ী নেতৃত্বের পথ হতে পারে না। নারী নেতৃত্ব তখনই সার্থক ও মর্যাদাপূর্ণ হবে, যখন তা কোনো করুণার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়ে, সমতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিকশিত হবে। নারীর আত্মমর্যাদা ও প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে করুণার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

লেখকঃ কবি, নারীনেত্রী, ডিরেক্টর নারী টিভি ও সহসভাপতি জাতীয় নারী সাহিত্য পরিষদ।